ড্যাভসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন “শান্তি বোর্ড” ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে গাজা অঞ্চলের পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ১৯টি দেশের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বোর্ডের প্রতিষ্ঠা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ট্রাম্প নিজেকে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রচেষ্টার কেন্দ্রে স্থাপন করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগের পেছনে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার হতাশা ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানে ব্যর্থতা নিয়ে তার সমালোচনা উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, এই বোর্ডের সম্ভাবনা রয়েছে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা গড়ে তোলার, এবং তিনি নিজেকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন।
প্রাথমিকভাবে গাজা অঞ্চলের যুদ্ধবিরতি তদারকি ও পুনর্নির্মাণের জন্য গঠিত বোর্ডটি এখন থেকে বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানের দায়িত্ব নিতে পারে, যা জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য প্রতি দেশকে এক বিলিয়ন ডলার প্রদান করতে হবে, যা আর্থিক বাধা হিসেবে কাজ করতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানো এবং তার দেশ ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ করার পর এই সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রধান মিত্র দেশগুলো এই উদ্যোগে সন্দেহ প্রকাশ করে, যেখানে যুক্তরাজ্য স্পষ্টভাবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানায়।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে নতুন শান্তি বোর্ডটি জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করবে, যদিও তার পূর্ববর্তী মন্তব্যগুলো প্রায়ই দু’টি সংস্থার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করেছে। এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত, তবে আন্তর্জাতিক নীতি গঠনে নতুন শক্তির উদ্ভবের সম্ভাবনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানের একটি বড় অংশ গাজা অঞ্চলের পুনর্নির্মাণ পরিকল্পনার দিকে নিবদ্ধ ছিল। গাজার নতুন প্রশাসক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন যে মিশরের সঙ্গে রাফাহ সীমান্ত পারাপার আগামী সপ্তাহে উভয় দিকেই পুনরায় খোলা হবে। এই পদক্ষেপটি গাজা অঞ্চলের মানবিক সংকট লাঘবে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনারের উপস্থিতি এবং তার মন্তব্যগুলোও অনুষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তিনি গাজা পুনর্নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন, যা অঞ্চলটির দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
বিভিন্ন দেশ থেকে বোর্ডে স্থায়ী সদস্যপদের জন্য এক বিলিয়ন ডলার চাওয়া হলে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই উচ্চ ফি পরিশোধে সক্ষম নাও হতে পারে, যা বোর্ডের বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি ট্রাম্পের শান্তি বোর্ড সত্যিই জাতিসংঘের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করে এবং কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানে ভূমিকা রাখে, তবে এটি বৈশ্বিক শাসন কাঠামোতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে, যদি এটি জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বিভাজন বাড়তে পারে।
ড্যাভসে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গাজা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা এবং শান্তি বোর্ডের গঠন উভয়ই ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে এই উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
বৈশ্বিক নেতাদের উপস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, মানবিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক বিনিয়োগের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। তবে, এর বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা, আর্থিক অবদান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মানের উপর।



