ঢাকার বাড্ডা এলাকায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এবং ডেনমার্কের অ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়া, হাবিগঞ্জ অ্যাগ্রো লিমিটেডের মধ্যে রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম (RAS) ব্যবহার করে ইলিশ, এশিয়ান সিবাস ও গ্রুপার মাছের বাণিজ্যিক চাষের জন্য দুই বছরের মধ্যে ৩ কোটি ইউরো বিনিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি দেশের সামুদ্রিক মাছের চাহিদা পূরণ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে করা হয়েছে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে হাবিগঞ্জ অ্যাগ্রো লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক নাসের আহমেদ, অ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ইয়েনস ওলে ওলেসেন এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রাণ গ্রুপের অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও অংশগ্রহণ করেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রধান ব্যবসা হল প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য, আর অ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়া হল ডেনমার্কের অগ্রণী রিসার্কুলেটিং ফিশ ফার্মিং প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। দুই সংস্থা যৌথভাবে রিক্যাপচারড একো-সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ইনডোর ফিশ ফার্ম স্থাপন করবে, যা সীমিত স্থানে উচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করবে।
RAS প্রযুক্তি ব্যবহার করে জল পুনর্ব্যবহার, তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়। ফলে রোগের ঝুঁকি কমে এবং মাছের বৃদ্ধির হার বাড়ে। পরিকল্পিত ফার্মে ইলিশ, এশিয়ান সিবাস ও গ্রুপার মাছের গড় ওজন ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হবে, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন চট্টগ্রাম বিভাগের মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অথবা উভয় পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত অন্য উপযুক্ত স্থানে করা হবে। মীরসরাই অঞ্চলের অবকাঠামো, লজিস্টিক্স সুবিধা এবং রপ্তানি পোর্টের নিকটতা এই স্থানের নির্বাচনকে সমর্থন করে।
প্রতিটি চক্রে প্রায় ২,০০০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। উৎপাদিত মাছের বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হবে, আর অবশিষ্ট অংশ দেশীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করা হবে। রপ্তানি মূলধন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ভোক্তাদের জন্য উচ্চমানের সামুদ্রিক মাছ সরবরাহের লক্ষ্য।
প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা উল্লেখ করেন, দেশের ও বৈশ্বিক বাজারে সামুদ্রিক মাছের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, তাই RAS পদ্ধতিতে এই ধরনের চাষ শুরু করা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিযুক্ত। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ইতিমধ্যে সীমিত স্থানে এই প্রযুক্তি দিয়ে সফল ফার্ম চালু রয়েছে এবং বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শিল্প পর্যায়ে সিবাস মাছের উৎপাদন শুরু হবে।
অ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার ড. ইয়েনস ওলে ওলেসেন জানান, রিসার্কুলেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে জল ব্যবহার কমে এবং পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস পায়, যা টেকসই মাছ চাষের মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই প্রকল্পটি দেশের ফিশিং সেক্টরে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উৎপাদন দক্ষতা বাড়াবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইলিশ ও সিবাসের রপ্তানি মূলধন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং উচ্চ মানের পণ্য চাহিদা স্থিতিশীল। ২,০০০ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হলে, বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা রপ্তানি আয় সম্ভাবনা দেখা যায়, যা দেশের মৎস্য শিল্পের মোট রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ হতে পারে।
প্রকল্পের বাস্তবায়ন স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। রিক্যাপচারড সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ, গুণমান নিয়ন্ত্রণ ও লজিস্টিক্সে প্রায় ২০০-২৫০টি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খলে মাছের চারা, ফিড এবং প্যাকেজিং শিল্পে পরোক্ষভাবে কাজের সুযোগ বাড়বে।
তবে প্রযুক্তি স্থানান্তর, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মশক্তির অভাব ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রিসার্কুলেটিং সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশনাল দক্ষতা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। এছাড়া রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা ও মানদণ্ডের পরিবর্তনও প্রকল্পের লাভজনকতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, প্রাণ-আরএফএল ও অ্যাসেনটপ্ট অ্যাকুয়ার যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সফল বাস্তবায়ন হলে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি টেকসই মাছ চাষের মডেল হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জন করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অন্যান্য মূল্যবান মাছের চাষে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।



