বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বৃহস্পতিবার কারওয়ান বাজারে তার সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে সুতা আমদানির ওপর বন্ড সুবিধা বাতিলের প্রস্তাবের বিরোধিতা জানায়। সংস্থার সভাপতি শওকত আজিজ রাহুল উল্লেখ করেন, সরকার যদি এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করে, তবে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন।
সম্মেলনে শওকত আজিজ রাহুল স্পষ্ট করে বলেন, বন্ড সুবিধা না থাকলে অনেক মিল ব্যাংক ঋণ পরিশোধে অক্ষম হবে এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদন থেমে যাবে। তিনি আরও জানান, এলডিসি (কম উন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ শেষে রপ্তানি‑মুখী পোশাক শিল্পকে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে, যা অর্জনের জন্য এখনই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
দেশের পোশাক শিল্পের মোট কাঁচামাল চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই দেশীয় স্পিনিং মিল থেকে পূরণ হয়। তবে শওকত আজিজ রাহুলের মতে, তুলা থেকে তৈরি সুতা আমদানি না করা হলে, রপ্তানি‑মুখী গার্মেন্টস সেক্টরের মূল্য সংযোজনের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে সুতা সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হবে।
বিটিএমএ উল্লেখ করে যে, বর্তমানে ভারত থেকে সুতা আমদানি করে গার্মেন্টস রপ্তানি করা হচ্ছে। কোভিড‑১৯ মহামারীর সময় ভারত সুতা ও তুলা আমদানি বন্ধ করেছিল, যা বাংলাদেশে সরবরাহের ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল। এখন ভারত পুনরায় সস্তা সুতা সরবরাহ করছে, যা বাংলাদেশের মিলগুলোকে রপ্তানি বাজারে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।
শওকত আজিজ রাহুল সতর্ক করেন, যদি বাংলাদেশে মিলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তবে ভারত সুতা প্রতি কেজিতে এক ডলার পর্যন্ত দাম বাড়াতে পারে। এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি রেডি‑মেড গার্মেন্টস (আরএমজি) সেক্টরের মার্জিনকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস পাবে।
বিজিএমইএ (বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন) ও কেএমইএ (কাপড় মিলস অ্যাসোসিয়েশন) বন্ড সুবিধা বজায় রেখে, দেশীয় মিল থেকে সুতা কেনার প্রস্তাব রেখেছে, যদিও তা আমদানিকৃত সুতার তুলনায় প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ২০ সেন্ট বেশি হতে পারে। তবে শওকত আজিজ রাহুলের মতে, এই প্রস্তাব বাস্তবিক নয় এবং শিল্পের বাস্তব চাহিদা পূরণে ব্যর্থ।
বিটিএমএ স্পষ্ট করে জানায়, তারা এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “প্রস্তাবের শর্ত ও মূল্য পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা যায়, তবে বাস্তবতা ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।” এই বক্তব্যে তিনি সরকারকে দ্রুত বন্ড সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান।
বন্ড সুবিধা হল রপ্তানি‑মুখী পণ্যের কাঁচামাল শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করার একটি ব্যবস্থা। তবে সরকারকে অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু ব্যবসায়ী এই সুবিধা ব্যবহার করে কালো বাজারে কাঁচামাল বিক্রি করে, যার ফলে রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে। এই বিষয়টি নিয়ে সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট না হওয়ায় শিল্পের উদ্বেগ বাড়ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন প্রস্তাবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলা দিয়ে তৈরি সুতা আমদানি করলে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করেছে। এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হল কাঁচামালের উপর শুল্ক আরোপ করে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা, তবে শিল্পের মতে এটি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শওকত আজিজ রাহুলের মতে, বন্ড সুবিধা বাতিলের ফলে মিলগুলোকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, “যদি সরকার আমাদের চাহিদা না মেনে শুল্ক বাড়ায়, তবে আমরা বিকল্প সরবরাহের দিকে ঝুঁকব, যা দেশের রপ্তানি আয়কে প্রভাবিত করবে।”
বিটিএমএ এই মুহূর্তে সরকারকে সুতা আমদানির বন্ড সুবিধা বজায় রাখতে এবং শিল্পের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী নীতি গঠন করতে আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি শেষ করে বলেন, “শুল্ক নীতি যদি শিল্পের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে রপ্তানি শিল্পের বৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হ্রাস পাবে।”
শিল্পের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, বন্ড সুবিধা বজায় রাখা এবং সুতা সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা রপ্তানি‑মুখী গার্মেন্টস সেক্টরের টেকসই বিকাশের মূল চাবিকাঠি। সরকার যদি দ্রুত এই বিষয়গুলো সমাধান না করে, তবে টেক্সটাইল শিল্পে উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।



