ঢাকা, ২৪ এপ্রিল— যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিযুক্ত দূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের দক্ষিণ এশিয়ার চীনা প্রভাব নিয়ে মন্তব্যের পর চীনের দাখিলকৃত দাপ্তরিক বিবৃতি ঢাকায় প্রকাশিত হয়েছে। চীনা দূতাবাসের মতে, এই মন্তব্যগুলোকে “অবিবেচক এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলা হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্যের মূল বিষয় এবং প্রাসঙ্গিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট নিচে উপস্থাপন করা হলো।
মিডিয়া ইন্টারঅ্যাকশনে ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশকে সম্ভাব্য চীনা জড়িত প্রকল্পের ঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বিস্তৃত প্রভাবকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের সহযোগিতা বেছে নেয়, তবে তা কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে তা বিশদে জানাতে প্রস্তুত থাকবেন বলে জানিয়েছেন। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চীনা দূতাবাসের বিবৃতি তৎক্ষণাৎ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যকে “অবিবেচক এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” বলে নিন্দা জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত পাঁচ দশক ধরে চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকে উভয় দেশই পারস্পরিক সমতা বজায় রেখে সহযোগিতা চালিয়ে আসছে। এই সময়কালে দুই দেশই একে অপরের স্বার্থকে সম্মান করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা বহু ক্ষেত্রে উভয় জনগণের সমর্থন পেয়েছে এবং তা অঞ্চলীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। অবকাঠামো, শক্তি, কৃষি ও ডিজিটাল সেক্টরে যৌথ উদ্যোগগুলোকে উভয় দেশের জনগণের জন্য সরাসরি উপকারি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সহযোগিতা অঞ্চলীয় অর্থনৈতিক সংহতি বাড়াতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে চীন ও বাংলাদেশের সহযোগিতা শুধুমাত্র দুই দেশের সরকার নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তাই কোনো তৃতীয় দেশের মন্তব্যকে এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে হস্তক্ষেপকারী হিসেবে দেখা উচিত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চীন জোর দিয়ে বলেছে যে দুই দেশের সহযোগিতা সম্পূর্ণভাবে দু’পক্ষের স্বেচ্ছা এবং স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অঞ্চলীয় কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তীব্রতর হয়েছে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশকে উভয় শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে উভয় দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে ক্রিস্টেনসেনের মন্তব্যকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
চীনা দূতাবাসের প্রতিক্রিয়া এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বতন্ত্র ভূমিকা রাখতে চায় এবং কোনো বাহ্যিক চাপকে অগ্রাহ্য করে। উভয় দেশের কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়া এখনো বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্যের ফলে ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সংলাপের স্বর পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে, এই ধরনের প্রকাশনা দু’পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের স্তরকে প্রভাবিত করতে পারে।
আসন্ন মাসগুলোতে ঢাকা ও পিকিংয়ের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক মিটিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বাণিজ্য, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও চালু রয়েছে, যা বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনৈতিক নীতি বজায় রাখার প্রচেষ্টা নির্দেশ করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার ধারাবাহিকতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমন্বয় কীভাবে হবে, তা অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতকের চীনের প্রভাব নিয়ে সতর্কতা এবং চীনের তাৎক্ষণিক প্রত্যাখ্যানের মধ্যে একটি তীব্র কূটনৈতিক টান দেখা যাচ্ছে। যদিও উভয় পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষার দাবি রাখে, তবে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার ইচ্ছা এই উত্তেজনাকে সাময়িকভাবে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক সমন্বয় হবে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।



