আর্কটিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মাঝখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য মূল্যের ওপর স্পষ্ট মন্তব্য করেন। তিনি রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জানিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ডেনমার্কের কাছ থেকে এই বিশাল দ্বীপটি কিনতে চায়, তবে তার দাম প্রায় এক বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই মূল্যায়ন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের ভূখণ্ড ক্রয়ের ঐতিহাসিক উদাহরণকে ভিত্তি করে করা হয়েছে।
পুতিনের মতে, ১৮৬৭ সালে রাশিয়া আলাস্কা যুক্তরাষ্ট্রকে ৭.২ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেছিল, যা তখনের জন্য বিশাল লেনদেন ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, আজকের স্বর্ণের দামের এবং গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক বিস্তারের ভিত্তিতে একই ধরনের লেনদেনের মূল্য এক বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। এই হিসাবের ভিত্তিতে তিনি যুক্তি দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ এই পরিমাণ অর্থ সহজে প্রদান করতে সক্ষম।
পুতিনের মন্তব্য শুধুমাত্র মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ডেনমার্কের গ্রিনল্যান্ডের ওপর দীর্ঘমেয়াদী শাসনকে কঠোর এবং শোষণমূলক হিসেবে চিত্রিত করেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের মতে, ডেনমার্কের শাসনকাল জুড়ে দ্বীপের বাসিন্দাদের সঙ্গে ঔপনিবেশিক আচরণ করা হয়েছে, যা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনুচিত। তিনি এই শাসনকে “অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর” বলে বর্ণনা করেন এবং ডেনমার্কের ঐতিহাসিক নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন।
রাশিয়া এই বিতর্ককে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে এবং মস্কোর সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই বলে উল্লেখ করেছে। পুতিনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, রাশিয়া কোনো ভূখণ্ডিক দাবি না করে কেবলমাত্র দুই দেশের মধ্যে আলোচনার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে চায়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্রয়ের বিষয়ে কোনো বাধা না দিয়ে, তবে ডেনমার্কের নীতি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের সম্ভাবনা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত হয়েছে। যদিও কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি, তবে পূর্বে প্রকাশিত নথি ও বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের জন্য এই দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়। পুতিনের মন্তব্য এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, বিশেষ করে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে।
ডেনমার্কের সরকার এখনও গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে পুতিনের সমালোচনা ডেনমার্কের নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করতে পারে, কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে মানবাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।
রাশিয়া এই মুহূর্তে কোনো সরাসরি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি, তবে তার মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, মস্কো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সমতা রক্ষা করতে চায়। পুতিনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ডের মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে চায়।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, পুতিনের এই মন্তব্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে আলোচনার গতি বাড়তে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের দিকে অগ্রসর হয়, তবে ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে, রাশিয়ার এই প্রকাশনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
আর্কটিকের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই দ্বীপের মালিকানা নিয়ে যে কোনো পরিবর্তন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক অধিকার এবং সম্পদ শেয়ারিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। পুতিনের মূল্যায়ন এই দিক থেকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
ভবিষ্যতে কি ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে রাশিয়ার স্পষ্ট মন্তব্য এবং ডেনমার্কের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা এখন গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত মূল্য এবং ডেনমার্কের শাসন কাঠামোর ওপর পুনরায় মূল্যায়ন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, পুতিনের বক্তব্য গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য ক্রয়মূল্যকে এক বিলিয়ন ডলার হিসেবে নির্ধারণের পাশাপাশি ডেনমার্কের শাসনকে কঠোর ও শোষণমূলক হিসেবে সমালোচনা করেছে। রাশিয়া এই বিষয়কে দুই দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে, তবে আন্তর্জাতিক আলোচনায় তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এই বিবৃতি আর্কটিকের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক গতিপথে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে প্রকাশ পাবে।



