ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা আজ থেকে শুরু হয়েছে; নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা মেনে প্রার্থীরা প্রচার চালাচ্ছেন। তবে ঐতিহ্যবাহী রোড শোয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে, যেখানে ভোটারদের মনোভাব গঠন করা হচ্ছে।
ইসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী বিজ্ঞাপন ও কন্টেন্টের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিপ-ফেকের সম্ভাব্য অপব্যবহার রোধে। এই নিয়মের মধ্যে মিথ্যা ভিডিও, অডিও বা ছবি পোস্ট করা নিষিদ্ধ, এবং কোনো কন্টেন্টে স্পষ্টভাবে উৎস উল্লেখ করতে হবে।
ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোন দল বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কী ধরনের বার্তা বেশি শেয়ার হচ্ছে—এই সব বিষয়ই ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। তাই ডিজিটাল উপস্থিতি বাড়ানো দলীয় কৌশলের একটি অপরিহার্য অংশ।
কাতারভিত্তিক আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত নভেম্বরের শুরুর দিকে একটি গান সামাজিক মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে এই গানের ভিডিও লক্ষ লক্ষ বার দেখা যায়, এবং মন্তব্যে এর লিরিকের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
গানের লিরিক এমন যে, প্রথমে শোনালে গ্রামীণ জীবনের স্নিগ্ধ চিত্র ফুটে ওঠে: “নৌকা, ধানের শীষ আর লাঙলের দিন শেষ; দাঁড়িপাল্লায় গড়বে নতুন বাংলাদেশ।” তবে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই শব্দগুলো রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
‘নৌকা’ শব্দটি আওয়ামী লীগের প্রতীক, যা শীর্ষে থাকা শীর্ষ নেতার সঙ্গে যুক্ত। ‘ধানের শীষ’ বিএনপির লাল রঙের চিহ্নকে নির্দেশ করে, আর ‘লাঙল’ জাতীয় পার্টির প্রতীক। শেষের ‘দাঁড়িপাল্লা’ জামায়াতের নির্বাচনী চিহ্ন, যা গানের মূল বার্তা হিসেবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার ইঙ্গিত দেয়।
গানটি মূলত জামায়াতের রাজনৈতিক সংগীত, এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তা ভাইরাল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন কোণে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মিডিয়ার অ্যালগরিদমের সাহায্যে ভিডিওটি দ্রুত শেয়ার হয়, ফলে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, যেখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন দশ দলীয় জোটের মধ্যে। যদিও মাঠ পর্যায়ের প্রচারণা আজ থেকে শুরু হলেও, অনলাইন যুদ্ধ কয়েক মাস আগে থেকেই তীব্র হয়ে আছে।
রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে জেন-জি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ডিজিটাল কন্টেন্টে জোর দিচ্ছে। ২০২২ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে জেন-জি ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটেছিল, যা এখন আবার রাজনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের গান একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে; দলটি সামাজিক মিডিয়ায় নিজস্ব সঙ্গীত, ভিডিও ও গ্রাফিক্স ব্যবহার করে তরুণদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। একই সময়ে অন্যান্য দলও ইউটিউব চ্যানেল, টিকটক চ্যালেঞ্জ ও ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে নিজেদের নীতি ও স্লোগান প্রচার করছে।
ইসি ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে, যাতে কোনো অবৈধ কন্টেন্ট বা মিথ্যা তথ্য প্রচার না হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সামাজিক মিডিয়ার নিয়মিত পর্যালোচনা ও শাসন প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান এই নতুন লড়াই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট যে, ডিজিটাল কন্টেন্টের গুণমান ও পৌঁছানোর ক্ষমতা এখন নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



