ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে যে, অন্তত দুইজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্ব রাখলেও তা তাদের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। উভয় প্রার্থীর ব্রিটিশ নাগরিকত্বের তথ্য টিআইবির কাছে রয়েছে, তবে সংস্থা তাদের নীতিমালা অনুসারে এই তথ্য প্রকাশে বাধ্য নয় বলে জানিয়েছে।
টিআইবির কর্মীরা ধানমন্ডি সদর দফতরে একটি সংবাদ সম্মেলনে এই ফলাফল উপস্থাপন করেন। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, “আমাদের কাছে দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য আছে, তবে আমরা স্বেচ্ছায় তা প্রকাশ করছি না; তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেব।” একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন যে, কিছু প্রার্থীর সম্পদ সম্পর্কিত তথ্যও হলফনামায় বাদ পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি প্রার্থীর নির্ভরশীলদের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে এক দশমিক চার মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২১০ কোটি টাকা) মূল্যের বাড়ি কেনা হয়েছে, যা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। বাড়িটি কেনার সময় শেল কোম্পানির মাধ্যমে লেনদেন করা হয়েছিল, যার মালিকানা দুবাইতে নিবন্ধিত। টিআইবি এই তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানিয়েছে।
অন্য একটি প্রার্থীর ক্ষেত্রে, যদিও তিনি বিদেশে নিজের কোনো সম্পদের কথা স্বীকার করেননি, তবে তার স্ত্রীর নামে দুবাইতে একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে। তদুপরি, আরেকজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা ঘোষণা করলেও, টিআইবির অনুসন্ধানে দেখা যায় প্রকৃত সম্পদের সংখ্যা কমপক্ষে তিন গুণ বেশি এবং মোট মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকার কাছাকাছি।
একজন প্রার্থী বিদেশে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকানা স্বীকার না করলেও, টিআইবির তথ্য অনুসারে মোট এগারোটি প্রতিষ্ঠান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে আটটি বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। এছাড়া, আরেকজন প্রার্থীর ‘কর স্বর্গে’ কোম্পানির নিবন্ধন সংক্রান্ত পুরনো তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে, যদিও হলফনামায় তা উল্লেখ করা হয়নি।
টিআইবির কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম উল্লেখ করেন, “প্রার্থীদের সম্পদ ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করেছি এবং প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষকে জানাব।” তিনি আরও বলেন, সংস্থার নীতি অনুযায়ী প্রার্থীদের স্বেচ্ছায় প্রকাশিত তথ্যের বাইরে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে জনসাধারণের স্বার্থে তা জানানো প্রয়োজন।
এই প্রকাশনা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে। দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং বিদেশি সম্পদের তথ্য না প্রকাশের ফলে ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তবে টিআইবি জোর দিয়ে বলেছে, তারা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
প্রতিবেদনটি নির্বাচনের আগে প্রকাশিত হওয়ায়, প্রার্থীরা ও তাদের দলগুলো থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে। ভবিষ্যতে যদি এই তথ্যগুলোকে ভিত্তি করে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতায় প্রভাব ফেলবে।
টিআইবির এই তথ্য প্রকাশের ফলে, নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখিত তথ্যের যথার্থতা ও সম্পূর্ণতা নিয়ে সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার তদারকি বাড়বে বলে আশা করা যায়। একই সঙ্গে, ভোটারদের জন্য প্রার্থীদের পটভূমি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংস্থার এই উদ্যোগের পর, নির্বাচনী কমিশনকে তথ্য যাচাই ও সংশোধনের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি কোনো প্রার্থী হলফনামায় ভুল বা অপ্রকাশিত তথ্য প্রদান করে থাকে, তবে তা বাতিলের কারণ হতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যের ভিত্তিতে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের অপেক্ষা করা হবে। ভোটারদের জন্য এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করবে, যা তাদের ভোটের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।



