বাংলাদেশে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণা সম্প্রতি নীতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এই ধারণা কী, কীভাবে সমাজের সব স্তরে সমান সুযোগ সৃষ্টি করে এবং বাস্তবায়নে কী বাধা রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য হল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নাগরিকদের সমান অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
গণতন্ত্রের বিশ্লেষণ সাধারণত রাজনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাস্তবে এটি বহু মাত্রা নিয়ে গঠিত। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের পাশাপাশি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক দিকের সমতা অন্যান্য সব ক্ষেত্রের সমতা ও উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হল সকলের জন্য সমান খেলার মাঠ তৈরি করা। এর জন্য প্রথমে প্রত্যেকের সক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মৌলিক সেবার সমান প্রবেশাধিকার থেকে শুরু হয়। এই সেবাগুলো শুধু পরিমাণে নয়, গুণগত মানেও সমান হওয়া দরকার, যাতে মানুষ সত্যিকারের উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে।
মানবিক সক্ষমতা গড়ে উঠলে, উৎপাদনশীল সম্পদের সমান ভাগাভাগি নিশ্চিত করা জরুরি। ভূমি, ঋণ, আর্থিক সম্পদ, কর্মসংস্থান এবং তথ্য-প্রযুক্তি (আইসিটি) সবই সমানভাবে নাগরিকদের কাছে পৌঁছাতে হবে। এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার না থাকলে সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।
বিশেষ করে গ্রামীণ ও নগর দু’প্রান্তে ভূমি ও ক্রেডিটের অসম বণ্টন লক্ষ্য করা যায়। কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, সাশ্রয়ী মূল্যের জমি ও আধুনিক প্রযুক্তি সরবরাহ করা হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবা ও ইন্টারনেটের প্রবেশাধিকার বাড়িয়ে তথ্যের সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
সম্পদ ভাগাভাগির পাশাপাশি পরিবেশগত সম্পদ—বন, জলাশয় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ—ও সকলের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। এই ধরনের কমনসের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না হলে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীই সুবিধা পাবে, যা অর্থনৈতিক অসমতা বাড়িয়ে দেবে। তাই স্থানীয় পর্যায়ে সমবায় ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নাগরিকের কণ্ঠ ও স্বায়ত্তশাসনের সুরক্ষা। মানুষকে এমন সিদ্ধান্তে অংশ নিতে হবে যা তাদের জীবনের সরাসরি প্রভাব ফেলে, এবং এই অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, বাস্তবিক কার্যকর হতে হবে।
দারিদ্র্য ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ প্রায়শই টোকেনিক্যাল থাকে; তাদের মতামত শোনার বদলে কাগজে নামিয়ে রাখা হয়। কার্যকর অংশগ্রহণের জন্য অর্থনৈতিক নীতি, পরিকল্পনা ও বিতর্কে সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা দরকার। এ ছাড়া অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
নীতিনির্ধারক, গবেষক ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত আলোচনায় সকল গোষ্ঠীর সমান উপস্থিতি থাকা উচিত। এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ নীতির ন্যায্যতা ও কার্যকারিতা বাড়ায়, ফলে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
সমান সুযোগ, কার্যকর অংশগ্রহণ ও সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে, দেশের আর্থিক লাভ সব নাগরিকের মধ্যে ভাগ করা সম্ভব হয়। তবে বাস্তবে কিছু গোষ্ঠী—যেমন বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠী—এখনো সম্পদের প্রবেশে বাধার সম্মুখীন। তাদের জন্য বিশেষ নীতি ও সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে এইসব দুর্বল গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি ও তাদের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীলতার ওপর। যদি তাদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সমানভাবে নিশ্চিত করা যায়, তবে সমগ্র সমাজের উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বাড়বে।
অবশেষে, নাগরিকদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ রাখা যায়: আপনার নিজস্ব পাড়া বা কর্মস্থলে এমন কোনো উদ্যোগ আছে কি যা সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করে? যদি না থাকে, তবে স্থানীয় সমবায়, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা পৌরসভার সঙ্গে মিলিয়ে এমন প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে। এই ধরনের ছোট পদক্ষেপই বৃহত্তর অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।



