বিএনপি চেয়ারপার্সন তরিক রহমান আজ সিলেটের গ্র্যান্ড সিলেট হোটেলে যুব নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ‘দ্য প্ল্যান: ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তরিক রহমান’ শিরোনামের ইন্টারেক্টিভ সেশনে উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রের কার্যকারিতা কেবল জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় স্তরে দৃঢ় হতে হবে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও গ্রামীন স্তরে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থাকলে নাগরিক সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন।
তরিকের বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রের সমস্যাগুলোর ওপর বিশেষ দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের হাসপাতাল ও ডাক্তারসংখ্যা রোগীর চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট কম, ফলে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক রোগী সঠিক চিকিৎসা পেতে পারেন না। ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সীমিত সম্পদে বৃহৎ সংখ্যক রোগীকে সেবা দেওয়া কঠিন হলেও তা সম্ভব হয়েছে।
হাসপাতাল নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, বাজেট বরাদ্দ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ুতা রোগীর জন্য অপেক্ষার সময় বাড়িয়ে দেয়, এ কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন। তরিকের মতে, দ্রুত ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা বাস্তবিক দৃষ্টিতে সম্ভব নয়; উন্নত দেশগুলোও নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্রীভূত করে।
স্থানীয় স্তরে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জন্য তিনি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণকে সমর্থন করেন। মৌলিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কিত সেবা গৃহস্থালিতে পৌঁছে দিলে হাসপাতালের ওপর চাপ কমে যাবে, এ ধারণা তিনি তুলে ধরেন।
শ্রমসংক্রান্ত বিষয়েও তরিকের মন্তব্য থাকে। তিনি বলেন, প্রতি বছর বিদেশে কর্মসংস্থান খোঁজে যাওয়া বহু বাংলাদেশি অযোগ্য কর্মী হিসেবে সীমিত আয় অর্জন করে। এই সমস্যার সমাধানে বিএনপি প্রযুক্তি ও পেশাগত শিক্ষার আধুনিকায়ন, ভাষা প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের পরিকল্পনা করেছে, যাতে তরুণরা জাপান, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো বাজারে দক্ষ পেশাদার হিসেবে কাজ করতে পারে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও তিনি অতীতের কিছু পদক্ষেপের উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়া (সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন) সময়কালে মেয়েদের জন্য বিনামূল্যের শিক্ষা চালু করা হয়েছিল, যা নারী শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তরিকের মতে, এসব নীতি বর্তমানের শিক্ষা নীতিতে পুনরায় সংযোজনের মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারও স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। সরকারী সূত্রে উল্লেখ আছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, স্বাস্থ্যবীমা সম্প্রসারণ এবং টেকসই শিক্ষা প্রকল্প চালু করা হয়েছে। তবে তরিকের মন্তব্যে দেখা যায়, এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন ও সেবা গুণমানের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে।
তরিকের এই বক্তব্যের পর সিলেটের যুব নেতারা প্রশ্নোত্তর সেশনে বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করেন। তারা স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার জন্য নির্দিষ্ট নীতি প্রস্তাব করেন, যেমন ইউনিয়ন পরিষদের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি, স্থানীয় বাজেটের স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণ। তরিক এসব প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিএনপি এই দিকগুলোকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করবে।
বিশ্লেষকরা তরিকের এই বক্তৃতাকে বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চেয়েছেন। বিশেষ করে, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানকে কেন্দ্র করে তিনি ভোটারদের আশ্বাস দিচ্ছেন যে, বিএনপি সরকার গঠনের পর এসব ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেবে।
অবশ্যই, তরিকের বক্তব্যের পর্যালোচনা চলবে। সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে এই প্রস্তাবগুলোকে গ্রহণ করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তবে স্পষ্ট যে, স্থানীয় স্তরে গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কার আনা, এবং যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা—এগুলোই বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।



