১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তৈরি একটি ফটোকার্ড সামাজিক নেটওয়ার্কে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ছবির বামদিকের উপরে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের লোগোর অনুকরণে তৈরি ভিন্ন লোগো, নিচের বাম কোণে তারিখ এবং মাঝখানে চ্যানেলের ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেখা যায়। ডানদিকে “বিস্তারিত কমেন্টে” লেখা ছিল।
এই ফটোকার্ডের পোস্টে মন্তব্য বিভাগে বিভ্রান্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এক মন্তব্যকারী দাবি করে যে মিডিয়া “চাঁদাবাজি” করে, আর অন্যজন একইভাবে বিএনপি-কে চাঁদাবাজি করার অভিযোগে তোলেন। ফটোকার্ডটি একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে শেয়ার করা হয়, তবে সংশ্লিষ্ট মিডিয়া কোনো এধরনের ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশের রেকর্ড দেয়নি।
বছরের শেষের দিকে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ভোটের আগে, আনুষ্ঠানিক প্রচার ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে, তবে সামাজিক মিডিয়ায় ইতিমধ্যে প্রচারমূলক বিষয়বস্তু এবং গুজবের বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অন্য দুইটি নকল ফটোকার্ডে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদা মিতু এবং দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে। একটি কার্ডে “মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে হোটেল ওয়েস্টিনে নাহিদ ইসলাম” লেখা ছিল, আর অন্যটিতে “প্রার্থিতা পাননি মাহমুদা মিতু, গভীর রাতে সান্ত্বনা দিলেন নাহিদ ইসলাম” উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুইটি কার্ড ভিন্ন মিডিয়ার নকশা শৈলীতে তৈরি হলেও, উক্ত মিডিয়াগুলো কোনো সংশ্লিষ্ট ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা রিউমর স্ক্যানার গত বছর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, মিডিয়ার নাম, লোগো ও শিরোনাম নকল করে ৬৮৭টি ঘটনার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি ৭৫টি মিডিয়া জড়িত হয়ে মোট ৭৪৪টি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। গড়ে প্রতিদিন দুইটির বেশি ভুয়া তথ্য মিডিয়ার নাম ব্যবহার করে প্রচারিত হয়েছে, যা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে।
ডিসমিসল্যাবের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর সনাক্তকৃত ভুল তথ্যের ২১ শতাংশ গ্রাফিক বা ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতার, সরকারের উপদেষ্টার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তার নামে ভুয়া উক্তি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভুয়া ফটোকার্ডের ৭৪ শতাংশই মূল মিডিয়ার ফটোকার্ড নকল করে তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের আগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্যের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী কমিশন সামাজিক মিডিয়ায় তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে, ভোটের আগে প্রচারিত ভুয়া গ্রাফিক্স ভোটারদের মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুন্ন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, নকল ফটোকার্ড চেনার জন্য লোগো, ফন্ট, তারিখ এবং ওয়েবসাইটের ঠিকানার সঠিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। এছাড়া, মূল মিডিয়ার অফিসিয়াল পেজে প্রকাশিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে কোনো পার্থক্য থাকলে তা সন্দেহের কারণ হতে পারে।
সামাজিক মিডিয়ায় শেয়ার করা তথ্যের উৎস যাচাই না করে দ্রুত শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা এবং সন্দেহজনক গ্রাফিক্সের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই ধরনের ভুয়া তথ্যের বিস্তার নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থির করতে পারে, ফলে ভোটারদের সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা সৃষ্টি হয়। তাই, নির্বাচনের পূর্বে এবং চলাকালীন সময়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা, মিডিয়া ও নাগরিক উভয়েরই দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভবিষ্যতে, নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় মিডিয়া সংস্থাগুলোকে তাদের লোগো ও শিরোনামের সুরক্ষা বাড়াতে হবে এবং নকল তথ্যের দ্রুত সনাক্তকরণের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে, ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে গুজবের প্রভাব কমানো সম্ভব হবে।



