সিরিয়ার উত্তর-পূর্বের হাসাকা প্রদেশে ২১ জানুয়ারি বুধবার এসডিএফের চালিত একটি ড্রোন আক্রমণে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সাতজন সদস্য প্রাণ হারিয়ে এবং কমপক্ষে বিশজন আহত হয়েছে। ঘটনাস্থল আল-ইয়ারুবিয়াহ সীমান্ত পারাপারের নিকটবর্তী একটি গুলিবিদ্ধ ডিপো, যেখানে ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম ও স্বয়ংক্রিয় বিস্ফোরক উপাদান সংরক্ষিত ছিল। সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করে এবং উল্লেখ করেছে যে হামলাটি গোপন কর্মশালার সন্ধান পাওয়ার পর তৎক্ষণাৎ সংঘটিত হয়।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সিরিয়ান ইউনিটগুলো আল-ইয়ারুবিয়াহ সীমান্তে একটি গোপন কর্মশালা আবিষ্কারের পর সেখানে ড্রোন ও ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) তৈরির কারখানা পেয়েছে। তদন্তে ইরানীয় উৎপাদিত বেশ কয়েকটি ড্রোনও পাওয়া যায়, যেগুলো এসডিএফের ব্যবহার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছিল। সেনাবাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তল্লাশি শুরু করার মুহূর্তে এসডিএফের একটি আত্মঘাতী ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, ফলে ঘটনাস্থলে তৎক্ষণাৎ সাতজন সৈনিকের মৃত্যু হয় এবং আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এই আক্রমণটি ঘটার ঠিক এক দিন আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্সি এবং এসডিএফের মধ্যে হাসাকা প্রদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি পারস্পরিক সমঝোতা স্বাক্ষরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সমঝোতা অনুযায়ী, দু’পক্ষের মধ্যে চার দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, যা স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত আটটায় শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে সিরিয়ার অপারেশন কমান্ড এই ড্রোন হামলাকে ‘বিপজ্জনক উসকানি’ এবং ‘যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই ঘটনা সিরিয়ার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে নতুন সংকটে ধাক্কা দিয়েছে। এক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “হাসাকা অঞ্চলে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে বহু পক্ষের স্বার্থের সংঘর্ষে জটিল। এসডিএফের ধারাবাহিক ড্রোন ও কামান হামলা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং অঞ্চলে পুনরায় উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।” তিনি আরও যোগ করেন, “ইরানের সরবরাহিত ড্রোনের উপস্থিতি ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জটিল সম্পর্কের প্রতিফলন, যা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতে বহিরাগত প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলছে।”
আঞ্চলিক কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই ঘটনার প্রতি সতর্কতা প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি মিশন ইতিমধ্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং উভয় পক্ষকে সমঝোতা রক্ষা করতে আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্ক, যা সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে, তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে কোনো একতরফা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
ইরানের সরকার এখনও এই ঘটনার বিষয়ে কোনো মন্তব্য প্রকাশ করেনি, তবে পূর্বে সিরিয়ার নিরাপত্তা ক্ষেত্রে তার সমর্থন ও সরঞ্জাম সরবরাহের কথা স্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ্লোম্যাটিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ওয়াশিংটন এই ধরনের ড্রোন হামলাকে ‘অবৈধ’ বলে গণ্য করে এবং সিরিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অতিরিক্ত চাপ আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
সিরিয়ার সেনাবাহিনীর অপারেশন কমান্ডের মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে শেষ হতে পারে, এবং সেই সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে পুনরায় আলোচনার দরকার হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন যে, যদি এই ধরণের লঙ্ঘন অব্যাহত থাকে, তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হতে পারে, যেখানে সিরিয়া, ইরান, তুরস্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবে।
সামগ্রিকভাবে, হাসাকা প্রদেশে ড্রোন হামলা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে এবং অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ভবিষ্যতে কী ধরণের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করবে, তা সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।



