জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিক থেকে উপহারের কর সংক্রান্ত বিধান সংশোধন করেছে। নতুন নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পদ হস্তান্তর করমুক্ত রাখা হয়েছে, আর অন্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কর আরোপিত হবে।
পূর্বে স্বামী‑স্ত্রী, পিতা‑মাতা এবং সন্তানদের মধ্যে করা দান বা উপহার সম্পূর্ণভাবে করমুক্ত ছিল। এই তিনটি সম্পর্কের বাইরে কোনো হস্তান্তরে করের দায়িত্ব আরোপিত হতো, যদিও কিছু ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ওপর স্পষ্টতা ছিল না।
এখন থেকে ভাই‑বোনের মধ্যে সম্পদ হস্তান্তরও করমুক্ত তালিকায় যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, আপনার নিজের ভাই বা বোনকে নগদ, সোনার গহনা, জমি‑ফ্ল্যাট ইত্যাদি উপহার দিলে তা আয়কর আইন অনুযায়ী করের আওতায় পড়বে না। এই পরিবর্তন পারিবারিক আর্থিক সমর্থনকে সহজতর করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বহিরাগত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্যও স্পষ্টতা আনা হয়েছে। অনেকেই বিদেশে কাজের আয় তাদের ভাই‑বোনের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে থাকেন, কিন্তু পূর্বে এই লেনদেনের করমুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এখন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকার বেশি লেনদেন করা হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে করমুক্ত হিসেবে স্বীকৃত হবে।
এমন লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ, অস্থাবর (যেমন গয়না, সোনার পণ্য) এবং স্থাবর (যেমন জমি, ফ্ল্যাট) সম্পদ সবই অন্তর্ভুক্ত। ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে রেকর্ডেড লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ার ফলে ট্যাক্স অডিটের ঝুঁকি কমবে এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
কর রিটার্নে এই ধরনের উপহার কীভাবে উল্লেখ করতে হবে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার ভাই আপনাকে দুই লাখ টাকার উপহার দেয়, তবে আপনি তা আপনার আয়কর রিটার্নে ‘উপহার’ শিরোনামে উল্লেখ করবেন, তবে কোনো কর আরোপ হবে না। একইভাবে, আপনি আপনার ভাইকে তার রিটার্নে এই দানটি উল্লেখ করতে বলবেন, যাতে উভয়ের রেকর্ডে স্বচ্ছতা থাকে।
অন্যদিকে, শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রাপ্ত উপহারের ওপর কর আরোপিত হবে। শ্বশুর‑শাশুড়ি, শ্যালক‑শ্যালিকা এবং অন্যান্য শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে নগদ, গয়না, জমি বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পদ গ্রহণ করলে তা আয়কর আইনের অধীনে করযোগ্য হবে, কারণ এই সম্পর্কগুলো করমুক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীতি পরিবর্তন পরিবারিক নগদ প্রবাহে নতুন গতিপথ তৈরি করবে। স্নেহের বন্ধনে ভিত্তিক আর্থিক সমর্থন এখন করের ঝামেলা ছাড়াই সম্ভব হবে, ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে সম্পদ পুনর্বণ্টন বাড়বে।
রিয়েল এস্টেট সেক্টরেও প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ভাই‑বোনের মধ্যে জমি বা ফ্ল্যাটের হস্তান্তর করমুক্ত হওয়ায় সম্পত্তি বিক্রির চেয়ে হস্তান্তর পদ্ধতি বেশি জনপ্রিয় হতে পারে, যা লেনদেনের গতি বাড়াবে এবং রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি ইত্যাদি সংক্রান্ত রাজস্বে সাময়িক হ্রাস ঘটাতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের জন্যও ইতিবাচক দিক রয়েছে। উচ্চ মূল্যের উপহারের জন্য ব্যাংকিং চ্যানেল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, ফলে ডিপোজিট ও ট্রান্সফার ভলিউম বাড়বে। একই সঙ্গে, স্বচ্ছ লেনদেনের রেকর্ড ট্যাক্স এডমিনিস্ট্রেশনকে সহজ করবে এবং অবৈধ অর্থ প্রবাহের ঝুঁকি কমাবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, এনবিআরের এই পদক্ষেপে কর রাজস্বে সাময়িক হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে পারিবারিক সম্পদ গঠনের গতি ত্বরান্বিত হবে। সরকার যদি এই নীতি থেকে আয়কর সংগ্রহে ক্ষতি কমাতে অতিরিক্ত নজরদারি ব্যবস্থা যোগ করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। সংক্ষেপে, ভাই‑বোনের উপহারের করমুক্তি পরিবারিক আর্থিক পরিকল্পনাকে সহজ করবে, তবে শ্বশুরবাড়ির উপহারের ওপর কর আরোপিত থাকায় পারিবারিক সম্পর্কের আর্থিক দিকেও সতর্কতা প্রয়োজন।



