বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডেভোস) ২০২৪‑এর অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রইল। তিনি আমেরিকান অর্থনীতির শক্তি, গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের ইচ্ছা এবং অন্যান্য দেশের নেতাদের প্রতি সমালোচনামূলক মন্তব্যে মনোযোগ আকর্ষণ করেন। বিশেষ করে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে সরাসরি সম্বোধন করে তিনি কানাডার যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যে তিনি কানাডার প্রতি একধরনের স্মরণ করিয়ে দেন যে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া টিকে থাকতে পারে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের ইঙ্গিতকে সতর্কতা বা সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
একই সময়ে, ট্রাম্প ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে সানগ্লাস পরা অবস্থায় উল্লেখ করে মন্তব্য করেন এবং সুইজারল্যান্ডের প্রাক্তন ফেডারেল কাউন্সিলের সদস্য কারিন কেলার‑সুটারকে তার আচরণে অস্বস্তিকর বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক নেতাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
ডেভোসে ট্রাম্পের ভাষণের পরের দিন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি একই ফোরামে একটি শক্তিশালী বক্তৃতা দেন। তিনি “মহাশক্তি”র অর্থনৈতিক প্রভাবকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে সতর্কতা জানান এবং বিশ্বে বর্তমান পরিবর্তনকে “বিচ্ছিন্নতা” হিসেবে বর্ণনা করেন, রূপান্তর নয়। কার্নি বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হেজেমনি নিয়ে আলোচনা করেন এবং ছোট দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে বড় শক্তির চাপ থেকে মুক্তি পেতে আহ্বান জানান।
কার্নির বক্তৃতা কানাডার অভ্যন্তরে ব্যাপক প্রশংসা পায়; এক সিনেটর এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কানাডার প্রধানমন্ত্রীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও তিনি সরাসরি ট্রাম্পের নাম উল্লেখ না করেন, তবু তার মন্তব্যগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
কানাডা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতির ফলে ধাতু ও গাড়ি সহ বেশ কয়েকটি মূল সেক্টরে চাপের মুখে রয়েছে। এছাড়া, উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA) পুনর্নবীকরণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং বর্তমানে বাধ্যতামূলক পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। কানাডা তার রপ্তানির প্রায় ৭৫% যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে, তাই এই চুক্তির পুনর্নবীকরণ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কানাডার বাণিজ্য মন্ত্রী মানিন্দার সিধু ট্রাম্পের মন্তব্যের সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি কানাডার জন্য চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি করেছে, তবে তিনি কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক শর্তাবলী উন্নত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে। কানাডা তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে এবং একই সঙ্গে অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চাইছে।
ডেভোসে অনুষ্ঠিত এই দুইটি বক্তৃতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা ও শক্তির ভারসাম্যকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ট্রাম্পের রেটোরিক এবং কানাডার স্বতন্ত্র অবস্থান উভয়ই বিশ্ব মঞ্চে নতুন গতিপথ নির্ধারণের সম্ভাবনা রাখে।
এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় দেশই এই সময়ে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সংলাপ বজায় রাখার চেষ্টা করবে, যদিও রাজনৈতিক রেটোরিকের তীব্রতা কখনও কখনও উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ডেভোসে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর, কানাডা তার বাণিজ্য নীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন দৃষ্টিকোণ গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনরায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের দিকনির্দেশনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



