নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলিম ইত্তেফাকের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে ভোট কেনাবেচা দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গুরুতর প্রভাব ফেলবে এবং এ ধরনের লেনদেন অস্বীকার করা অসম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের সব স্তরের মানুষ এই কার্যক্রমে জড়িত, তবে তাদের সনাক্ত করা কঠিন।
ইত্তেফাক তিনটি মূল পদ্ধতি প্রস্তাব করেন: প্রথমত, ভোটের সময় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপক অভিযান চালিয়ে জড়িত ব্যক্তিদের ধরা; দ্বিতীয়ত, ভোটের দিনগুলোতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা; তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সতর্কতা প্রচারণা চালানো।
বিশেষজ্ঞগণ এক সপ্তাহ আগে এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস) লেনদেন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পরামর্শ দেন। এছাড়া প্রার্থী, রাজনৈতিক দল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক ও এমএফএস হিসাবকে নির্বাচনের সময় বিশেষ নজরদারির আওতায় আনা উচিত। ভোট কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থীর পদত্যাগ তাত্ক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হবে বলে তারা জোর দেন।
কঠোর আইন প্রণয়নের কথাও বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবিত বিধানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোট কেনাবেচা প্রমাণিত হলে প্রার্থীর দায়িত্ব তৎক্ষণাৎ বাতিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর ফৌজদারি মামলা দায়ের, লেনদেনে যুক্ত এজেন্টদের গ্রেফতার এবং কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। এছাড়া প্রার্থী দল এবং নিকটজনের ব্যাংক ও এমএফএস হিসাবকে নির্বাচনের সময় বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে।
প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমে, নির্বাচনের সময় লেনদেনের সংখ্যা ও পরিমাণ সীমিত করা, দৈনিক লেনদেনের সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। একাধিক ফোন নম্বরে একসঙ্গে টাকা পাঠালে স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হবে।
নতুন মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরের নিবন্ধন ও ক্যাশআউট সেবা নির্বাচন পূর্বে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে। নির্বাচনের দশ থেকে পনেরো দিন আগে নতুন বিকাশ, নগদ বা রকেট অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি বন্ধ করা হবে। বড় অঙ্কের ক্যাশআউটও সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে।
নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এমএফএসের যৌথ টাস্কফোর্স রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সন্দেহজনক লেনদেন সনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হবে। ভোটের আগে সাত দিন ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলোতে লেনদেনের উপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা হবে।
অপ্রয়োজনীয় লেনদেনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আদালতের অনুমতি নিয়ে ভোটারদের বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্টে নজরদারি করা হবে। এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোটারদের মধ্যে ভয় ও সতর্কতা ছড়িয়ে পড়বে, যা ভোট কেনাবেচা কমাতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, কেবল লেনদেন বন্ধ করলেই নয়, আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করে এবং দায়িত্বশীলদের ওপর কঠোর শাস্তি আরোপ করলেই নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। তদুপরি, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বেচ্ছায় তাদের সদস্যদের লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভোট কেনাবেচা রোধে আইন, প্রযুক্তি এবং জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হবে।
অবশেষে, নির্বাচনের পূর্বে এবং চলাকালীন সময়ে প্রস্তাবিত সব ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে ভোট কেনাবেচার সম্ভাবনা কমে যাবে এবং দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হবে।



