ড্যাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি এবং তার ভাষণ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বিটজারল্যান্ডের ড্যাভোসে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে ট্রাম্পের উপস্থিতি, তার বক্তব্যের মূল বিষয় এবং সেশনের সময় ঘটিত ঘটনাবলি বিশদভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ট্রাম্পের মঞ্চে প্রবেশের মুহূর্তে উপস্থিত ভিড়ের কাছ থেকে তীব্র স্বাগত জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীরা উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য হাততালি দিয়ে স্বীকৃতি জানায়, যা ফোরামের শুরুতে একটি উচ্ছ্বাসপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
তবে মঞ্চে পৌঁছানোর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতা লক্ষ্য করা যায়। বহু অংশগ্রহণকারী, যার মধ্যে কিছু রাষ্ট্রপ্রধানও অন্তর্ভুক্ত, প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে বাইরে থাকতে বাধ্য হন। নিরাপত্তা কর্মীরা প্রবেশদ্বার থেকে কঠোরভাবে যাচাই করে, এমনকি পরিচিত ব্যক্তিদেরও প্রবেশে বাধা দেন।
মঞ্চে উঠে ট্রাম্প প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যে শীতল স্বভাব বজায় রাখেন। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রতি ইতিবাচক মন্তব্য করেন, দেশের উন্নয়নের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন যে যুক্তরাজ্য “মহান” হতে পারে। এই ধরনের উষ্ণমনা মন্তব্য ফোরামের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রশংসা পায়।
ট্রাম্পের এই বন্ধুত্বপূর্ণ স্বর তার সামাজিক মাধ্যমের পূর্বের হুমকিমূলক টোনের সঙ্গে তীব্র পার্থক্য সৃষ্টি করে। পূর্বে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার ইচ্ছা প্রকাশের পর যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তার তুলনায় তিনি এই মুহূর্তে বেশি সংযত স্বরে কথা বলেন।
সেশনের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিকের একটি মন্তব্য শোনা যায়। তিনি ইউরোপীয় অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কঠোর শব্দ ব্যবহার করে বলেন, “আপনারা মৃত”। এই মন্তব্যের ফলে কিছু অংশগ্রহণকারী সেশন থেকে বেরিয়ে যান, যদিও ট্রাম্পের নিজস্ব মন্তব্যে একই রকম পদক্ষেপের কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
ট্রাম্পের পরবর্তী বক্তব্যে তিনি পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর প্রতি সম্মানজনক স্বর বজায় রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তার পূর্বের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টগুলো কিছু মিত্র দেশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং তিনি এখন আরও সংযতভাবে কথা বলতে চান।
গ্রিনল্যান্ডের বিষয়েও তিনি কিছুটা সংযত স্বরে কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন যে গ্রিনল্যান্ডের বিষয়টি সংবেদনশীল এবং তার পূর্বের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অতিরিক্ত মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিকভাবে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে, ডেনমার্কের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উদাহরণ দেন।
এরপরের অংশে ট্রাম্পের স্বর কিছুটা কঠোর হয়ে ওঠে। তিনি ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতির প্রতি সমালোচনা করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র না থাকত তবে হলের সবাই জার্মান ভাষায় কথা বলত। এই মন্তব্য ইউরোপীয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের প্রস্তাব। তিনি জানান যে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে তাত্ক্ষণিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা চুক্তি করতে ইচ্ছুক। তিনি এটিকে “আলোচনামূলক সমাধান” হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং উল্লেখ করেন যে এই প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিছু বিশ্লেষক এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতি পুনর্গঠনের সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, অন্যদিকে কিছু দেশ এটি স্বায়ত্তশাসন ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে।
ড্যাভোসে অনুষ্ঠিত এই সেশনটি ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক নীতি ও রূপান্তরকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন কীভাবে গড়ে উঠবে, তা পরবর্তী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সংলাপের মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



