মার্চের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি সভায় একটি বিশাল মহাজাগতিক গঠন প্রকাশিত হয়েছে, যার ব্যাস প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। এই রিংটি যদি বাস্তব হয়, তবে মহাবিশ্বের সমমিতি নীতির ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে, যা বৃহৎ স্কেলে মহাবিশ্বের দিকনির্দেশে সমতা দাবি করে।
সমমিতি নীতি, যা মহাবিশ্বের গঠনকে সমানভাবে বিতরণিত বলে ধরা হয়, পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক অনুমান এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বের নীতি হিসেবে বিবেচিত। এই নীতির ভিত্তিতে গঠিত সব তাত্ত্বিক মডেল বড় আয়তনের স্থানকে সমানভাবে ভরযুক্ত ধরে।
নতুন রিংটি পূর্বে রিপোর্ট করা “বৃহৎ ধনুক” গঠনের সম্প্রসারণ হিসেবে চিহ্নিত, এবং এর ভিতরে একটি ছোট কিন্তু তবু বিশাল “বড় রিং” রয়েছে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, একসাথে এই গঠনগুলো সমমিতি নীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে, কারণ এ ধরনের বিশাল কাঠামো নীতির পূর্বাভাসের বিপরীত।
এই রিংয়ের আবিষ্কারকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আলেক্সিয়া লোপেজ, যিনি কেন্দ্রীয় ল্যাঙ্কাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তিনি এবং তার দল দূরবর্তী কোয়াসারদের আলো ব্যবহার করে এই গঠনগুলো সনাক্ত করেন। কোয়াসার হল সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের চারপাশে ঘূর্ণায়মান উজ্জ্বল গ্যাসের ডিস্ক, যা বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে পৃথিবীর টেলিস্কোপে পৌঁছায়।
কোয়াসারদের আলো যখন মহাকাশের মধ্য দিয়ে যায়, তখন গ্যালাক্সি ও গ্যাসের পরমাণু দ্বারা শোষিত ও পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মধ্যবর্তী মহাকাশের ভরবণ্টন মানচিত্রায়িত করতে পারেন। লোপেজের দল স্লোয়ান ডিজিটাল সার্ভে (SDSS) থেকে প্রাপ্ত ডেটা ব্যবহার করে এই বিশাল রিংকে চিহ্নিত করেছে।
প্রথমে ২০২১ সালে “বৃহৎ ধনুক” গঠনটি লক্ষ্য করা হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে বিশ্লেষণে দেখা যায় যে এটি একটি বৃহত্তর রিংয়ের অংশ, যা ৩.৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষের বেশি বিস্তৃত। এই রিংটি পূর্বে জানা “বড় রিং”-এর চারপাশে ঘূর্ণায়মান, যা নিজেও বিশাল আকারের।
বৃহৎ গঠনগুলোর উপস্থিতি, বিশেষ করে এমন বিশাল রিং, মহাবিশ্বের সমমিতি নীতির জন্য নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে। যদি এই গঠনগুলো সত্যিই বিদ্যমান হয়, তবে মহাবিশ্বের বৃহৎ স্কেলের সমতা ধারণা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ে এই ধরনের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, কারণ সমমিতি নীতি ছাড়া বর্তমান মহাবিশ্বের তত্ত্বগুলো অস্থিতিশীল হয়ে যায়। তত্ত্ববিদরা উল্লেখ করেন, এই নীতি না থাকলে মহাবিশ্বের গঠন ও বিকাশের ব্যাখ্যা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই রিংয়ের আবিষ্কারকে সমর্থনকারী ডেটা এখনও বিশ্লেষণাধীন, এবং ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন হবে। গবেষকরা আশা করেন, পরবর্তী টেলিস্কোপ ও মহাকাশ মিশনের মাধ্যমে রিংয়ের সুনির্দিষ্ট গঠন ও ভরবণ্টন নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
মহাকাশের এই বিশাল রিং, যদি নিশ্চিত হয়, তবে এটি মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুনর্গঠন করতে পারে। এদিকে, বিজ্ঞানীরা সতর্কভাবে ডেটা যাচাই করে তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞান জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তবে একই সঙ্গে এটি গবেষকদের নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। সমমিতি নীতির সম্ভাব্য ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে এই রিংটি ভবিষ্যৎ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, এই ধরনের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আমাদের মহাবিশ্বের জটিলতা ও বিস্তৃতির নতুন দিক উন্মোচন করে, তবে তা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা ভয় তৈরি করা উচিত নয়। বিজ্ঞানীরা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে স্পষ্ট উত্তর প্রদান করবে।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন মহাবিশ্বের সমমিতি নীতি এখনও সঠিক, নাকি নতুন ডেটা আমাদেরকে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করবে?



