ঢাকা শহরে ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় কমিশন তার নতুন বেতন কাঠামোর প্রতিবেদন সরকার ও শ্রমিক গোষ্ঠীর সামনে উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে কর্মচারীদের বেতন গ্রেড অনুযায়ী সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কর্মীবাহিনীর বেতন ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা এবং বেতন বৈষম্য হ্রাস করা।
কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান বেতন কাঠামোতে বহু বছর ধরে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সত্ত্বেও সমন্বয় করা হয়নি। ফলে নিম্নবিত্ত কর্মচারীরা আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। নতুন প্রস্তাবিত স্কেলে মোট আটটি বেতন গ্রেড অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি গ্রেডের জন্য নির্দিষ্ট বেসিক বেতন এবং ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা মূলত এন্ট্রি-লেভেল কর্মী ও নিম্ন স্তরের সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত। অন্যদিকে, সর্বোচ্চ ১,৬০,০০০ টাকা উচ্চতর পদে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত, যা পূর্বের সর্বোচ্চ বেতনের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। কমিশন উল্লেখ করেছে যে, এই বেতন বৃদ্ধি কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
বেতন গ্রেডের বিশদ বিবরণে বলা হয়েছে যে, গ্রেড ১ থেকে গ্রেড ৩ পর্যন্ত কর্মচারীরা মূলত সহকারী, ক্লার্ক ও নিম্নস্তরের প্রযুক্তিগত কর্মী। গ্রেড ৪ ও ৫-এ মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত, যেখানে গ্রেড ৬ থেকে গ্রেড ৮ পর্যন্ত উচ্চতর ব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারক পদে কর্মরত ব্যক্তিরা থাকবে। প্রতিটি গ্রেডের বেতন নির্ধারণে কাজের দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা বিবেচনা করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বেতন কাঠামোর পাশাপাশি ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধার পুনর্বিবেচনারও সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, গৃহঋণ ও অবসরভাতা সংক্রান্ত নীতিগুলোকে আধুনিকায়ন করে কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবেদনটি সরকারকে পর্যালোচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারী পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি, তবে অনুমান করা হচ্ছে যে, সংসদে এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু হবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সংশোধনী প্রণয়ন করতে হবে।
শ্রমিক গোষ্ঠী ও বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রতিবেদনটি স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, বেতন বৃদ্ধি কর্মীদের জীবনের মান উন্নত করবে এবং কর্মসংস্থানের আকর্ষণ বাড়াবে। তবে তারা জোর দিয়েছে যে, বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে হওয়া দরকার, যাতে কোনো ধরণের বৈষম্য না থাকে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, বেতন বৃদ্ধি সরকারী ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা ও কর আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন যে, বেতন বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আর্থিক নীতি সমন্বয় করা প্রয়োজন।
কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো প্রয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে ২০২৭ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে এন্ট্রি-লেভেল ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় করা হবে, এরপর উচ্চতর পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হবে।
এই পদক্ষেপের ফলে সরকারি সেক্টরের মোট বেতন ব্যয় প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে কমিশন দাবি করে যে, এই ব্যয় বৃদ্ধি কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও সেবা মানের উন্নতির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
সর্বশেষে, কমিশন উল্লেখ করেছে যে, বেতন কাঠামোর পুনর্গঠন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে কর্মবাজারের পরিবর্তন ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনরায় সমন্বয় করা হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সরকারকে নিয়মিতভাবে বেতন নীতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে।



