বিএনপি ২০২৪ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতির সময় ৫৯ জন সদস্যকে পার্টির নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে বহিষ্কার করেছে, ফলে মোট বহিষ্কৃতের সংখ্যা ৭২-এ পৌঁছেছে। এই পদক্ষেপটি দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় পার্টির একতাবদ্ধতা বজায় রাখতে চাওয়া হয়েছে।
বিএনপি পূর্বে একই ধরনের লঙ্ঘনের জন্য প্রথমে ৯ জন, পরে অতিরিক্ত ৪ জনকে বহিষ্কার করেছিল। সেই সময়ে বহিষ্কৃতদের মধ্যে কিছুজন স্বেচ্ছায় প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা পার্টির কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও নির্বাচনী কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহল কবির রিজভীর রাত্রিকালীন বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বহিষ্কারের কারণ হল পার্টির নীতি, আদর্শ এবং শৃঙ্খলা লঙ্ঘন করা। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, এমন আচরণ পার্টির স্বার্থের বিপরীত এবং নির্বাচনী সময়ে অনুপযুক্ত।
বহিষ্কারের তালিকায় বিভিন্ন স্তরের উচ্চপদস্থ নেতারা অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে জেলা স্তরের সহ-সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং উপজেলায় কাজ করা সহ-সদস্যরা রয়েছেন। এই পদক্ষেপটি পার্টির অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি নির্বাচনী প্রার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
রংপুর বিভাগে তিনজন সদস্যকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। প্রথমজন হলেন দিনাজপুর-২ আসনের আ ন ম বজলুর রশিদ, যিনি দিনাজপুর জেলার সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং বিরল উপজেলার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। দ্বিতীয়জন হলেন দিনাজপুর-৫ আসনের এ জেড এম রেজয়ানুল হক, যিনি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। তৃতীয়জন নীলফামারী-৪ আসনের রিয়াদ আরাফান সরকার রানা, যিনি সৈয়দপুর জেলার সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক।
রাজশাহী বিভাগে মোট আটজন সদস্যকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। নওগাঁ-৩ আসনের পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি মহাদেবপুর উপজেলার সদস্য, নাটোর-১ আসনের তাইফুল ইসলাম টিপু সহ-দপ্তর সম্পাদক এবং জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, এবং একই আসনের ইয়াসির আরশাদ রাজন জেলা স্তরের সদস্য। নাটোর-৩ আসনের দাউদার মাহমুদ যুগ্ম আহ্বায়ক, রাজশাহী-৫ আসনের ইসফা খাইরুল হক শিমুল পুঠিয়া উপজেলার সদস্য, এবং রেজাউল করিম লন্ডন জিয়া পরিষদের সহসভাপতি, পাশাপাশি পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনের দুইজন সদস্যও তালিকাভুক্ত।
খুলনা বিভাগে ছয়জন সদস্যকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে। কুষ্টিয়া-১ আসনের নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা, যিনি দৌলতপুর উপজেলার সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, নড়াইল-২ আসনের মনিরুল ইসলাম জেলা স্তরের সাধারণ সম্পাদক, যশোর-৫ আসনের শহিদ ইকবাল মনিরামপুর থানার সভাপতি, সাতক্ষীরা-৩ আসনের শহীদুল আলম জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, বাগেরহাট-১ আসনের মাসুদ জেলা স্তরের সদস্য এবং বাগেরহাট-৪ আসনের খায়রুজ্জামান শিপন জেলা স্তরের সদস্য।
বিএনপি নেতৃত্বের মতে, এই বহিষ্কারের মাধ্যমে পার্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা স্বার্থপরতা না থাকে তা নিশ্চিত করা হবে। রুহল কবির রিজভী উল্লেখ করেছেন যে, পার্টির নীতি অনুসরণ না করা সদস্যদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ লঙ্ঘন না ঘটে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, এই পদক্ষেপটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। বহিষ্কৃতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন স্থানীয় স্তরে প্রভাবশালী ছিলেন, তাই তাদের বাদ পড়া পার্টির নির্বাচনী জালকে পুনর্গঠন করতে বাধ্য করবে। তবে একই সঙ্গে, শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া পার্টির ভক্তদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগাতে পারে।
বিএনপি এখন নতুন প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো গড়ে তুলছে। বহিষ্কারের ফলে শূন্যস্থান পূরণে নতুন মুখ উন্মোচিত হবে, যা পার্টির তরুণ নেতৃত্বের উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ৫৯ জন সদস্যের বহিষ্কার এবং মোট ৭২ জনের বাদ পড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে পার্টির ভবিষ্যৎ কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন এবং ভোটার ভিত্তি গঠনে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি হতে পারে, যা আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলবে।



