ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে গাজা‑সংক্রান্ত প্রস্তাবিত শান্তি বোর্ডে যোগ দিতে সম্মত হয়েছেন, যা তার অফিস বুধবার নিশ্চিত করেছে। এই বোর্ডটি গাজার শাসক গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের অংশ হিসেবে গঠনের পরিকল্পনা, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় গৃহীত হয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর অংশগ্রহণকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে জারি করা যুদ্ধাপরাধের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বোর্ডের সদস্য তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ আইসিসি-এ অভিযুক্ত কয়েকজন নেতার নাম অন্তর্ভুক্ত, এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং টনি ব্লেয়ারসহ অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত। এই ব্যক্তিরা গাজার স্থিতিশীলতা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমন্বিত নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজা‑সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বীকৃতি পায় না সব দেশ। সুইডেন, নরওয়ে এবং ইতালি সহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ আমন্ত্রণ পেয়েও অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। চীনও আমন্ত্রণ পেয়েছে, তবে এখনও তার অংশগ্রহণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে নেতানিয়াহুর অংশগ্রহণকে নিয়ে উদ্বেগের স্রোত প্রবাহিত হয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনি যুক্তি দেন যে, তার উপস্থিতি গাজার দ্বিতীয় ধাপের অগ্রগতিতে বড় বাধা হতে পারে, কারণ তার প্রধান লক্ষ্য হামাসকে অস্ত্রহীন করা, আর সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শান্তি বোর্ডের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে নেতানিয়াহুর ভূমিকা কীভাবে সীমাবদ্ধ করা হবে তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত গাজা‑সংক্রান্ত আলোচনার ফলাফল অনিশ্চিত রয়ে যাবে।
আইসিসি কর্তৃক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা তার অংশগ্রহণকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য গাজার মানবিক সংকট কমানো, তবু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ধরনের আইনি বাধা কীভাবে সমাধান করা হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়।
শান্তি বোর্ডের কার্যক্রমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের অংশগ্রহণও দৃষ্টিগোচর, যা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পুতিনের উপস্থিতি পূর্বে রাশিয়ার গাজার ওপর প্রভাব বাড়ানোর ইচ্ছা এবং অঞ্চলে তার কূটনৈতিক ভূমিকা শক্তিশালী করার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন।
বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা সত্ত্বেও, গাজার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন এখনও বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গাজার মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য প্রয়োজনীয় ত্রাণ সামগ্রী ও পুনর্নির্মাণ কাজের ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন, পাশাপাশি হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে স্থায়ী অস্ত্রবিরতি অর্জনই মূল লক্ষ্য।
পরবর্তী ধাপে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত এই শান্তি বোর্ডের কার্যক্রম কীভাবে গঠিত হবে এবং কোন শর্তে গাজার অবস্থা উন্নত হবে তা নির্ধারণ করা হবে। আন্তর্জাতিক আইনি বাধা, রাজনৈতিক স্বার্থ ও মানবিক চাহিদার সমন্বয়কে কীভাবে সামলানো হবে, তা গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গাজা‑সংক্রান্ত এই নতুন উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে অংশগ্রহণকারী সকল দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, আইনি বাধার সমাধান এবং গাজার জনগণের বাস্তব চাহিদার প্রতি সংবেদনশীলতার উপর। যদি এই শর্তগুলো পূরণ হয়, তবে গাজার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে এই শান্তি বোর্ডকে দেখা যেতে পারে।



