বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডেভোস)‑এ বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ইউরোপ যদি দ্বীপের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সাড়া না দেয়, তবে তা ভবিষ্যতে তার স্মৃতিতে থাকবে। তিনি এই মন্তব্যকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্র‑ইউরোপ সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রিনল্যান্ড, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশলগত স্বার্থের অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ছোট বরফের টুকরা দরকার, তবে ইউরোপীয় দেশগুলো তা সরবরাহে অনিচ্ছুক। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, যদিও তিনি তা ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রেসিডেন্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণের সুযোগ ছিল, তবে তিনি তা না নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তিনি যুক্তি দেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রই এই বরফের অংশটি নিজের হাতে রাখত, তবে তা সম্ভবত কোনো বিরোধের সৃষ্টি না করত। তবুও, ইউরোপের চাপের মুখে না গিয়ে এই সুযোগ ত্যাগ করা একটি কৌশলগত পছন্দ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ট্রাম্প ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য একটি বিকল্প উপস্থাপন করেন: যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে; অন্যদিকে প্রত্যাখ্যান করলে, যুক্তরাষ্ট্রের স্মৃতিতে থাকবে যে শক্তিশালী ও নিরাপদ আমেরিকাই শক্তিশালী ন্যাটোর ভিত্তি। এই যুক্তি থেকে তিনি ন্যাটোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং প্রতিদিনের ভিত্তিতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।
প্রেসিডেন্ট স্পষ্টভাবে বলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য তিনি বলপ্রয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ না করলেও, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অপ্রতিরোধ্য হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এমন কোনো পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করবেন না। এই বক্তব্যটি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক নীতি মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার ইঙ্গিত দেয়।
নাটো সংক্রান্ত আলোচনায় ট্রাম্প ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদ—যে কোনো সদস্যের ওপর আক্রমণকে সকলের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হয়—এর ঐতিহাসিক ব্যবহার উল্লেখ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধারাটি কেবল একবার, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই তথ্যটি ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে।
ট্রাম্প ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি প্রকাশের পাশাপাশি, তাদের সমর্থন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকবে, তবে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো কি সত্যিই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়াবে, তা তিনি নিশ্চিত নন। এই মন্তব্যটি ইউরোপীয় জোটের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।
বক্তব্যের শেষ অংশে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পুনরুত্থানকে জোর দিয়ে তুলে ধরেন, পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড়, শক্তিশালী ও উন্নত রূপে ফিরে আসার কথা বলেন। তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় উপস্থিতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভবিষ্যতে বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে পুনর্মিলনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্যগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব এবং ন্যাটোর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা নীতির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নীতির পুনর্বিবেচনা ও জোটের কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে।
অধিকন্তু, ট্রাম্পের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি এবং ন্যাটোর সমর্থন নিয়ে তার অনিশ্চয়তা ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কৌশল, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক সমঝোতায় নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডেভোসে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ও ন্যাটো সম্পর্কিত বক্তব্য আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, যুক্তরাষ্ট্র‑ইউরোপ সম্পর্ক এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। তার মন্তব্যগুলো কূটনৈতিক চাপ, সামরিক প্রস্তুতি এবং জোটের ঐতিহ্যিক নীতির পুনর্মূল্যায়নের দিকে ইঙ্গিত করে, যা পরবর্তী সপ্তাহে বিশ্ব রাজনীতির অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলবে।



