আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বুধবার টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম-নির্যাতনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, শাসনকালে বিরোধী মতের মানুষদের গুম করে অক্ষম করা ছিল সরকারের পরিকল্পিত কৌশল।
এই সেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গুমের ঘটনাগুলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে বিচার করা এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের আইনি দায়িত্বে আনতে প্রমাণ সংগ্রহ করা। মামলাটি ১৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কয়েকজন প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা।
প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, গুমের ঘটনাগুলো কেবল কয়েকজনের নিখোঁজ হওয়া নয়, বরং একটি বিস্তৃত রাষ্ট্র নীতি যা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে নিঃশব্দ করে তুলেছে। তিনি যুক্তি দেন, শাসনকালে গুমের পদ্ধতি কোনো মৃতদেহ গোপন করা নয়, বরং বিরোধীকে ‘জীবন্ত লাশ’ করে অক্ষম করা।
এ ধরনের কৌশলকে তিনি ‘আওর্মি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রীয় শাসনপদ্ধতি’ বলে বর্ণনা করেন, যেখানে গুমের শিকারদের অন্ধকার কুঠরিতে মাসের পর মাস বাঁধা রাখা হয়। এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী নির্যাতন সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যা একটি স্থায়ী ক্ষত হিসেবে রয়ে যায়।
প্রসিকিউটর আরও উল্লেখ করেন, গুমের কৌশল কেবল শারীরিকভাবে মানুষকে অক্ষম করে না, বরং শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে বহু শিকারের দেহকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। এ ধরনের নির্যাতন প্রকাশ্যে মৃত্যুর মাধ্যমে নয়, বরং শিকারের জীবনকে অচল অবস্থায় আটকে রাখে।
শিকারদের পরিবার প্রায়শই জানে না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। এই অনিশ্চয়তা পরিবারকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয় এবং পুরো সমাজকে শাস্তি দেয়, কারণ গুমের ভয়জনক পরিবেশে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা অনুভূতি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
সেশনে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান গুম-নির্যাতনের মামলায় সাক্ষ্য প্রদান করেন। তিনি ১৭ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করেন, যার মধ্যে রয়েছে শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব। তার সাক্ষ্য গুমের পদ্ধতি ও তার সামাজিক প্রভাবকে স্পষ্ট করে।
অভিযুক্ত তালিকায় শামিল রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার সঙ্গে কয়েকজন প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব। সকলের বিরুদ্ধে গুমের মাধ্যমে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন, শারীরিক অক্ষমতা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুম-নির্যাতনকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনি দায়িত্বে আনার জন্য প্রমাণ সংগ্রহে অগ্রসর হয়েছে। এই মামলায় গুমের শিকারদের পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
আসন্ন শুনানিতে আদালত গুমের পদ্ধতি, শিকারের অবস্থান, এবং নির্যাতনের প্রকৃতি বিশদভাবে পর্যালোচনা করবে। বিচারকগণ প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে রায় প্রদান করবেন এবং গুমের শিকারদের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ও বিবেচনা করা হবে।
এই মামলার ফলাফল দেশের মানবাধিকার নীতি ও আইনি কাঠামোর ওপর বড় প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। গুম-নির্যাতনের ব্যাপক দায়িত্বশীলতা প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে অনুরূপ কৌশল ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
মামলার অগ্রগতি ও পরবর্তী আদালতীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় গুমের শিকারদের পরিবার এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্কতা ও সমর্থন বজায় রাখবে, যাতে ন্যায়বিচার দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গতভাবে সম্পন্ন হয়।



