বাংলাদেশ সরকার রমজান মাসে ভোজ্যতেলের কৃত্রিম ঘাটতি রোধের জন্য আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয় (ডিপিএম) পদ্ধতিতে কানাডার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করার অনুমোদন দিয়েছে। এই চুক্তির মোট মূল্য ৩৫৭ কোটি ৬২ লাখ ১০০ টাকা, যার ফলে প্রতি লিটারে ১৬৩ টাকা ৬ পয়সা খরচ হবে।
অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা বুধবার, ২১ জানুয়ারি, সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অর্থ উপদেষ্টা সভাপতিত্বে নিশ্চিত করা হয়। বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই তেল কেনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যাতে রমজানের শীর্ষ চাহিদা মোকাবেলায় বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং মূল্য স্থিতিশীল থাকে।
কানাডার এনএসআরআইসি গ্রিন সাপ্লাইস ইনকর্পোরেটেড (উৎস: ব্রাজিল) থেকে তেল ক্রয় করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত দুই লিটার পেট বোতলে তেলের মূল্য ১৩১ টাকা ৪৯ পয়সা নির্ধারিত, যেখানে টিসিবি গুদাম পর্যন্ত সব অতিরিক্ত খরচসহ চূড়ান্ত মূল্য ১৬৩ টাকা ৬ পয়সা হবে। সরকার এই তেলকে খোলাবাজারে ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করবে, ফলে কোনো ভর্তুকি প্রদান করা প্রয়োজন হবে না।
এই পদক্ষেপের পেছনে রমজান মাসে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি হওয়া রোধ করা এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা রয়েছে। তেল সরবরাহের এই অতিরিক্ত পরিমাণ বাজারে প্রবেশ করলে দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং সরবরাহ‑চাহিদার অমিল কমে যাবে।
এছাড়াও, সরকার পূর্বে ৬ জানুয়ারি একই উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে থাইল্যান্ডের প্রাইম কর্প ওয়ার্ল্ড কোম্পানি লিমিটেড থেকে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার লিটার পরিশোধিত সয়াবিন তেল ক্রয়ের অনুমোদন দিয়েছে। ঐ চুক্তির মোট ব্যয় ১৭৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৭ টাকা, যার ফলে প্রতি লিটারে ১৬২ টাকা ৬৩ পয়সা খরচ হয়েছে।
দুইটি ক্রয়ই সরাসরি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর কাছ থেকে করা, যা মধ্যস্থতাকারী বাদ দিয়ে খরচ কমাতে সহায়তা করে। তদুপরি, সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি সরকারকে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে, ফলে রমজানের শীর্ষ সময়ে ভোজ্যতেলের ঘাটতি রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের বড় পরিমাণের তেল আমদানি দেশের তেল শিল্পে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তেল বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি হবে।
কানাডা থেকে আসা তেলটি পরিশোধিত এবং দুই লিটার পেট বোতলে প্যাকেজ করা হবে, যা রিটেইল শপ, সুপারমার্কেট এবং হোলসেল বাজারে সরবরাহ করা হবে। তেলটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিতরণ করা হবে, যাতে সব অংশে সমানভাবে সরবরাহ নিশ্চিত হয়।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, তেল বিক্রির মূল্য নির্ধারণে বাজারের বর্তমান দামের তুলনায় কম রাখা হবে, যাতে ভোক্তাদের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে। এই নীতি অনুসরণে কোনো অতিরিক্ত ভর্তুকি বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে না, ফলে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই ক্রয়কে দেশের ভোজ্যতেল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। রমজান মাসে তেল চাহিদা বৃদ্ধি পেলে, সরবরাহের ঘাটতি মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে পারে, যা নিম্নআয়ের গৃহস্থালীর জন্য সমস্যাজনক হতে পারে। এই ক্রয় পরিকল্পনা সেই ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে।
সামগ্রিকভাবে, সরকার রমজান মাসে ভোজ্যতেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে দুইটি বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। প্রথমে থাইল্যান্ড থেকে ১.৩৫ কোটি লিটার তেল, এরপর কানাডা থেকে ২.৭১ কোটি লিটার তেল ক্রয় করা হবে। উভয় চুক্তিই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে সম্পন্ন, যা খরচ কমাতে এবং সরবরাহ দ্রুত করতে সহায়তা করে।
এই পদক্ষেপের ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে, দাম স্থিতিশীল থাকবে এবং ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত হবে। সরকার এভাবে রমজানের শীর্ষ চাহিদা মোকাবেলায় প্রো-অ্যাকটিভ নীতি গ্রহণ করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



