কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ২০ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র‑নেতৃত্বাধীন বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা বিশাল ভাঙনের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্কবার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবক্ষয়ই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
কার্নি দাভোসের মূল মঞ্চে তার বক্তব্য রাখার সময় উল্লেখ করেন, বিশ্ব এখন কোনো ধীর পরিবর্তনের পথে নয়, বরং গভীর ও দ্রুতগতির ভাঙনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্বের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলেন, বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্প‑পূর্ব স্বাভাবিক অবস্থা আর ফিরে আসবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক কাঠামোর সুবিধা ভোগ করেছে। উন্মুক্ত সমুদ্রপথ, আর্থিক স্থিতিশীলতা, সম্মিলিত নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা কানাডার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তবে বর্তমান বাস্তবতা অনুসারে, বিশ্ব এখন বৃহৎ শক্তিগুলোর চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে রূপান্তরিত হয়েছে। কার্নি উল্লেখ করেন, ক্ষমতাশালী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক চাপ ও প্রভাব বিস্তারের কৌশল গ্রহণ করছে, যা নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা হ্রাস করছে।
মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তন বিশেষ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। কার্নি বলেন, শুধুমাত্র নিয়ম মেনে চললেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এই ধারণা আর কার্যকর নয়। তিনি সতর্ক করেন, মাঝারি দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, না হলে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রান্তিক হয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, দেশগুলোকে কি কেবল নিজেদের চারপাশে প্রাচীর গড়ে রক্ষা করবে, নাকি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য একত্রিত হবে—এটাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন, আলোচনার টেবিলে না থাকলে দেশগুলোকে মেনুতে রাখা হবে, অর্থাৎ বড় শক্তিগুলো তাদের উপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
কার্নি উল্লেখ করেন, বড় শক্তিগুলোর বিশাল বাজার, সামরিক ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক চাপ আরোপের সক্ষমতা মাঝারি দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই পার্থক্যই আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি কানাডার অবস্থানকে উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুতি হলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দাভোসে একই মঞ্চে পরের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও ভাষণ শোনার কথা রয়েছে। ট্রাম্পের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার বর্তমান দিকনির্দেশনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
কার্নির মন্তব্যের পটভূমিতে কানাডা‑যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন আলোচনার সূচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে পুনর্মূল্যায়ন চলছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিশ্বের অন্যান্য মধ্যম শক্তি দেশগুলোও কার্নির সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক নিয়মের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পেলে দেশগুলোকে স্বতন্ত্র কূটনৈতিক কৌশল গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা বড় শক্তির চাপের মুখে টিকে থাকতে পারে।
সারসংক্ষেপে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্র‑নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা বিশাল ভাঙনের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং মধ্যম শক্তিগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, কানাডা‑যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যম দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



