নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুজন অবরুদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতার আদালত উপস্থিতি শেষে তাদের পিতার বাড়িতে ‘বেয়াইখানা’ আয়োজনের খবর প্রকাশ পায়। ঘটনাটি হাজতখানা জেলায় ঘটেছে, যেখানে দুজন নেতাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিতে আসার পর তাদের পিতার বাড়িতে খাবার পরিবেশন করা হয়।
এই অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পুলিশ তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নেয়। মঙ্গলবার রাতেই পাঁচজন উচ্চপদস্থ পুলিশ সদস্যের বদলি আদেশ জারি করা হয় এবং বুধবার দুপুরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারভাইজার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন।
বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সহকারী শহর উপপরিদর্শক (এটিএসআই) জাহেদুল ইসলাম ও কবির আহম্মদ ভূঁইয়া, পাশাপাশি কনস্টেবল বিল্লাল হোসেন, মো. হাসান এবং সাইফুল ইসলাম অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে জেলার বিভিন্ন পুলিশ পোস্টে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।
অনিয়মের তদন্তের জন্য পুলিশ একটি তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটি গতকালই কার্যক্রম শুরু করে এবং তদন্তের ফলাফল সাত কার্যদিবসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হতে পারে বলে জেলা শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অধিকাংশ তদন্তের দায়িত্বে থাকা কমিটির সদস্যদের নাম প্রকাশ না করলেও, তাদের কাজের পরিধি এবং সময়সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে। তদন্তের মূল লক্ষ্য হল আদালতে আসামিদের খাবার পরিবেশনের পেছনের কারণ ও দায়িত্বশীলদের চিহ্নিত করা।
হাজতখানা আদালতে উপস্থিতি ও ভূরিভোজের ঘটনা সম্পর্কে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আবদুর রহমানের মন্তব্যও উঠে আসে। তিনি আদালতে গিয়ে ঘটনাটি শুনে বলেন, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এভাবে আসামিদের খাবার খাওয়ানো গুরুতর অন্যায় এবং আদালতের পুলিশ পরিদর্শকও এর দায় থেকে মুক্ত নয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, দুজন নেতার মধ্যে একজন, এ. জে. এম. পাশা, কারাগারে থাকা অবস্থায়ও বিভিন্ন অপরাধের মামলায় জড়িত। তিনি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ছাত্রশিবিরের সাত কর্মীকে গুলি করে হত্যার মামলাসহ একাধিক মামলাের মুখোমুখি। অন্যজন, শাইফ উদ্দিন আহমদ, হাতিয়া, চরজব্বর ও কবিরহাট থানায় বিস্ফোরকসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে।
এই মামলাগুলি ইতিমধ্যে আদালতে চলমান এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রমাণ-প্রসঙ্গও যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। আদালত কর্তৃপক্ষের মতে, অপরাধের গুরত্ব বিবেচনা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে, স্থানীয় প্রশাসনও বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের নতুন দায়িত্বে নিয়োগের মাধ্যমে একই রকম অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বদলি আদেশের পাশাপাশি, তদন্ত কমিটি যে তথ্য সংগ্রহ করবে তা ভবিষ্যতে আদালতে উপস্থাপিত হবে। এতে যদি কোনো আইনগত লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাসনব্যবস্থার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, স্থানীয় জনগণ এবং আইনজীবী সমিতি উভয়ই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, আদালতে আসামিদের খাবার পরিবেশন করা শুধু প্রক্রিয়াগত লঙ্ঘন নয়, বরং বিচারিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি আঘাত।
অধিকাংশ বিশ্লেষক মতামত প্রকাশ করে, এমন ঘটনা যদি পুনরায় না রোধ করা হয়, তবে বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। তাই, তদন্তের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
হাজতখানা আদালতে এই অনিয়মের তদন্ত চলাকালীন, সংশ্লিষ্ট দুজন নেতার মামলা এখনও চলমান। আদালত তাদের বিরুদ্ধে থাকা অপরাধমূলক অভিযোগের ভিত্তিতে রায় প্রদান করবে।
পুলিশের বদলি ও তদন্ত কমিটির কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী আপডেট পাওয়া গেলে তা জনসাধারণের সঙ্গে শেয়ার করা হবে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের অধিকার রক্ষা করা হবে।
সারসংক্ষেপে, হাজতখানা আদালতে দুজন অবরুদ্ধ এএল নেতার ভূরিভোজের ঘটনা প্রকাশের পর, পাঁচজন পুলিশকে বদলি করা হয়েছে, একটি ত্রিস্তরীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন প্রত্যাশিত। এই পদক্ষেপগুলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ লঙ্ঘন রোধের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।



