২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন শেষে নতুন সরকারকে তৎক্ষণাৎ তিনটি প্রধান দেশের – ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র – প্রতি স্পষ্ট নীতি রূপরেখা তৈরি করতে হবে। এই নীতিগুলি দেশের নিরাপত্তা, বাণিজ্য, ঋণ, সীমান্ত, জলবায়ু, অভিবাসন এবং বঙ্গোপসাগরের স্বার্থকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করবে। বর্তমান সময়ে বিদেশ নীতি প্রায়ই রাজনৈতিক মেজাজের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়; এক সরকারকে ‘ভারত‑মিত্র’ বলা হয়, পরেরকে ‘চীন‑অনুকূল’ এবং তৃতীয়কে ‘ওয়াশিংটন‑প্রিয়’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। তবে বাস্তবে ঢাকা প্রতিদিনই তিনটি শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য, ঋণ, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে জড়িত।
বিদেশ নীতি কোনো পার্টির রঙে রাঙানো হলে তা দেশের স্বার্থের ওপর প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই বিদেশ নীতি ব্যবহার করে গৃহস্থালীর জন্য গল্প গড়ে তোলে; ফলে ভারতকে একটি প্রতীক, চীনকে আর্থিক চেকবুক এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো রক্ষাকর্তা, কখনো ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ধরণের চিত্রায়ন নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট করে এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গড়ে তোলাকে বাধা দেয়।
নতুন সরকারকে এই সমস্যার সমাধানে মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে: প্রতিটি দেশের প্রতি স্বতন্ত্র নীতি নির্ধারণ এবং তা জাতীয় রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নিশ্চিত করা। এই নীতিগুলি আদর্শগত সঙ্গতি বা জনসংযোগের চেয়ে বাস্তবিক নীতি নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে, যা প্রশাসন ও জনগণকে স্পষ্টভাবে জানাবে বাংলাদেশ কী চায়, কী ছাড়তে পারে না এবং স্বার্থের সংঘর্ষে কী অগ্রাধিকার দেবে।
স্পষ্ট নীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা ছোট ও মাঝারি আকারের দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নির্ভরযোগ্যতা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে দেশকে পূর্বানুমানযোগ্য হতে হয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশকে তিন দিক থেকে ভারত ঘিরে রেখেছে; এর ফলে নদী ব্যবস্থা, সীমান্ত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিবেশে ভারতের প্রভাব অপরিহার্য। চীন বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ক্ষমতার শীর্ষে এবং অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য মূলধন সরবরাহকারী। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বাজার বাংলাদেশকে রপ্তানি, আর্থিক সহায়তা এবং প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে রক্ষা করে।
এই তিনটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ভিন্ন হলেও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় বাজারে রপ্তানি ও সীমান্তে বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ দেশের মোট বাণিজ্যের বড় অংশ গঠন করে। চীনের বিনিয়োগ অবকাঠামো প্রকল্পে, বিশেষত রেলওয়ে ও শক্তি খাতে, উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রপ্তানি পণ্য ও সেবা, পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের পর যদি সরকার এই সম্পর্কগুলোকে স্পষ্ট নীতি কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে, তবে বিদেশে দেশের চিত্র স্থিতিশীল হবে এবং গৃহে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি পরিবর্তনের ঝুঁকি কমে যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে, নীতি নির্ধারণে যদি রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেওয়া হয়, তবে বিদেশি ঋণ, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং নিরাপত্তা চুক্তি প্রায়ই স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের জন্য বদলাতে পারে। এ ধরনের অস্থিরতা দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সুতরাং, নতুন সরকারকে এখনই একটি সমন্বিত নীতি কাঠামো তৈরি করে তা পার্টি ও সমাজের বিস্তৃত সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। এই নীতিগুলি সরকারী মন্ত্রণালয়, কূটনৈতিক মিশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে, যাতে ভবিষ্যতে ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও মূল দিকনির্দেশনা অক্ষুণ্ণ থাকে।
এধরনের নীতি কাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রথমে দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে, তৃতীয় পক্ষের চাপ ও স্বার্থের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সমন্বিত কৌশল তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে।
অবশেষে, স্পষ্ট নীতি নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে নির্ভরযোগ্য পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং গৃহে রাজনৈতিক বিরোধের মাঝেও নীতি ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



