বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাত : বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংক সংখ্যা ১০ থেকে ১৫টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে যথেষ্ট হতো, তবে বর্তমানে ৬৪টি ব্যাংক পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত ব্যাংক সংখ্যা প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়ে দেয় এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি করে, যা শেষ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমাতে পারে। এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ব্যাংকিং খাতের গঠনমূলক সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেন।
সেমিনারটি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গভর্নরকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের সামনে ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন।
গভর্নর উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হল শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা। সরকার ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নির্দেশে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় অনিয়ম দেখা যায়, যার পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার ত্রুটি রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের অনিয়ম অস্বীকার করা সম্ভব নয় এবং তা সংশোধনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী চারটি প্রধান সেক্টরের মধ্যে ব্যাংকিং তৃতীয় স্থানে রয়েছে, তবে বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেক্টরের ওজন প্রথম স্থানে রয়েছে। এর ফলে অন্যান্য আর্থিক সেক্টর যেমন বন্ড বাজার ও শেয়ারবাজারের বিকাশ ধীরগতিতে চলছে, যা সামগ্রিক আর্থিক কাঠামোর ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে।
গভর্নর ব্যাখ্যা করেন, সব সরকারই অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং সেক্টরের উপর নির্ভরশীল, তবে বাংলাদেশের বন্ড ও শেয়ারবাজারের পিছিয়ে থাকা এই নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদী (২০-২৫ বছর) ঋণ প্রদান করতে অনিচ্ছুক, ফলে অবকাঠামো ও বড় প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি দেখা দেয়। এছাড়া, ঋণ প্রদান করার পরই ঋণগ্রহীতাকে অতিরিক্ত শর্তে চাপা দেওয়ার প্রথা রয়েছে, যা ঋণগ্রহীতার আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. রেজাউল করিম, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক ড. মাহবুব উল্লাহ এবং সদস্যসচিব ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি সেমিনারের গুরুত্ব ও বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা এই বক্তব্যকে ব্যাংকিং সেক্টরের পুনর্গঠন ও সংহতির সংকেত হিসেবে দেখছেন। অতিরিক্ত ব্যাংক সংখ্যা পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ কমাতে পারে এবং ব্যাংকের লাভজনকতা হ্রাস করে। সংহতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যয় হ্রাস, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং লভ্যাংশ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অতিরিক্ত ব্যাংক সংখ্যা আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। প্রতিটি ব্যাংকের জন্য পর্যাপ্ত মূলধন ও পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে নন-পারফরমিং লোন (এনপিএল) বাড়ার ঝুঁকি থাকে। সংহতি ও মর্জার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর স্কেল অর্থনীতি অর্জন করা সম্ভব, যা ঋণ পুনর্গঠন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করবে।
গভর্নরের উল্লেখিত দীর্ঘমেয়াদী ঋণ না দেওয়ার প্রবণতা অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নে বাধা সৃষ্টি করে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০-২৫ বছরের মেয়াদী ঋণ প্রয়োজন, যা বর্তমান ব্যাংকিং নীতি পূরণ করে না। এই ঘাটতি পূরণে বন্ড বাজারের বিকাশ ও শেয়ারবাজারের তরলতা বাড়ানো জরুরি, যাতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদী তহবিলের প্রবাহ নিশ্চিত হয়।
সারসংক্ষেপে, গভর্নরের বক্তব্য ব্যাংকিং সেক্টরের গঠনমূলক সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে এবং সংহতি, শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদানের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ভবিষ্যতে ব্যাংক সংখ্যা কমিয়ে পরিচালন ব্যয় হ্রাস, শাসনব্যবস্থা উন্নত করা এবং অন্যান্য আর্থিক সেক্টরের বিকাশে মনোযোগ দিলে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।



