ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ড্যানিশ প্রতিনিধি ভিস্টিসেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় তীব্র ভাষায় তার বিরোধিতা প্রকাশ করেন। ভিস্টিসেনের বক্তব্য ড্যানিশ পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক সেশনে শোনা যায়, যেখানে তিনি গ্রিনল্যান্ডকে ড্যানিশ রাজতন্ত্রের ৮০০ বছরের ঐতিহাসিক অংশ হিসেবে উল্লেখ করে, “এটি বিক্রির জন্য নয়” বলে জোর দেন। এরপর তিনি সরাসরি ট্রাম্পকে “ফ*** অফ” বলে সম্বোধন করেন, যা পার্লামেন্টের ভিতরে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করে।
ভিস্টিসেনের মন্তব্যের পরই পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলা স্টিফানুটা হস্তক্ষেপ করে, পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে এমন অশালীন ভাষা ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্কতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের শব্দভাণ্ডার পার্লামেন্টের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সতর্কতা সত্ত্বেও, ভিস্টিসেন তার বাক্যাংশের বাকি অংশ ড্যানিশ ভাষায় শেষ করেন, যা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন করে তীব্র করে তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছেন। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদ এবং আর্টিক অঞ্চলে গলিত বরফের ফলে নতুন সমুদ্রপথের উন্মোচন রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অগ্রগতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্পের মতে, এই অঞ্চলটি ন্যাটো নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য, এবং তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের অধিগ্রহণ প্রয়োজন।
ডেনমার্ক সরকার, যা গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত অংশের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রাখে, ট্রাম্পের প্রস্তাবকে শুরুর থেকেই অস্বীকার করেছে। সরকার গ্রিনল্যান্ডের বিক্রয়কে “অবাস্তব” এবং “উদ্ভট” বলে খারিজ করেছে, এবং এই বিষয়টি কেবল ভূখণ্ডগত দাবি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি এবং ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে গভীর সংঘাতের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ড্যানিশ পার্লামেন্টে ভিস্টিসেনের তীব্র মন্তব্যের পেছনে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের ধারাবাহিক চাপের প্রতি বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন দেখা যায়। গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনস্থ সময়ে, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক তিক্ততা বাড়িয়ে তুলেছে। ভিস্টিসেনের ভাষা, যদিও অশালীন, তবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে শেয়ার করা হতাশা ও উদ্বেগের প্রকাশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এই ঘটনার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সমন্বিত নীতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়ছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দাবি মোকাবেলা করা যায়। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানকে সমর্থনকারী গোষ্ঠীও এই বিষয়কে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে তুলে ধরতে পারে।
ড্যানিশ পার্লামেন্টের এই সেশনের পর, নিকোলা স্টিফানুটা পার্লামেন্টের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ভাষা ব্যবহার না করার জন্য কঠোর নিয়ম প্রণয়নের ইঙ্গিত দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সদস্য দেশও গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত আলোচনায় আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে, যাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সারসংক্ষেপে, ড্যানিশ এমপি ভিস্টিসেনের ট্রাম্পের প্রতি তীব্র ভাষা ব্যবহার এবং গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার আহ্বান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার একটি নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি ও ইউরোপীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য নতুন আলোচনার দরজা খুলে দেবে।



