মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত প্রেস কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা অঞ্চলে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে গৃহীত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘বোর্ড অব পিস’‑এ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর অনাগ্রহের দিকে ইঙ্গিত করে। ট্রাম্পের মতে, মাখোঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সীমিত; তার মেয়াদ ২০২৭ সালের মে মাসে শেষ হবে এবং ফরাসি সংবিধান অনুযায়ী তিনি আর প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। তিনি যোগ দেন, শেষ পর্যন্ত মাখোঁকে বোর্ডে অংশ নিতে বাধ্য করা হবে, যদিও এখনো কোনো জোরপূর্বক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পেয়ে নভেম্বর ২০২৩‑এ গৃহীত হয়। এর মূল লক্ষ্য গাজায় তাত্ক্ষণিক যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে পুনরায় সহিংসতা রোধ করা। ট্রাম্প উল্লেখ করেন, এই কাঠামোতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা গাজার জনগণের নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনকে সমর্থন করবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ, যিনি ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের সমালোচনার মুখে ছিলেন, এখন পর্যন্ত বোর্ডে যোগদানের স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। ট্রাম্পের মন্তব্যে তিনি মাখোঁকে “রাজনৈতিকভাবে সীমিত” বলে বর্ণনা করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দেন, যা শুল্ক বাড়িয়ে ফরাসি পণ্য ও সেবা উপর প্রয়োগ করা হতে পারে।
ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মাখোঁকে বোর্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, “যদি ফ্রান্স এই উদ্যোগে অংশ না নেয়, তবে আমরা শুল্কের হার দ্বিগুণ করে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারি।” এই বক্তব্যে তিনি ফরাসি অর্থনীতির উপর সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত দেন, যদিও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা শর্ত উল্লেখ করা হয়নি।
বোর্ডে ইতিমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কীয়ার স্টারমার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম আমন্ত্রণের তালিকায় রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, এই তিনজন নেতার অংশগ্রহণ গাজার শান্তি প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেবে এবং অঞ্চলীয় নিরাপত্তা গ্যারান্টি বাড়াবে।
পুতিনের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ রাশিয়া গাজার ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্টারমার, যিনি সাম্প্রতিক সময়ে মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে জোর দিয়ে কথা বলেছেন, তার উপস্থিতি ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গাজার পরিস্থিতি সমাধানে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। মোদি, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি, তার অংশগ্রহণ গাজার পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ফরাসি সরকার থেকে কোনো তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, শুল্কের হুমকি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ফরাসি শিল্প ও বাণিজ্যিক সেক্টরে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে মাখোঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক তীব্র হতে পারে।
গাজার শান্তি বোর্ডের কার্যকারিতা ও আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনও এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছে এবং মানবিক সহায়তা সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তবে, মাখোঁর অনাগ্রহের পেছনে ফরাসি সরকার গাজার পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র নীতি অনুসরণ করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে গাজার নাগরিকদের জন্য তাত্ক্ষণিক প্রভাব কী হবে তা এখনও অনিশ্চিত। যুদ্ধবিরতি না হলে মানবিক সংকট বাড়তে পারে, আর শুল্কের হুমকি বাস্তবায়িত হলে ফরাসি সাহায্য ও পুনর্গঠন প্রকল্পে বিলম্ব হতে পারে। ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী, যদি মাখোঁ শেষ পর্যন্ত বোর্ডে যোগ দেন, তবে গাজার শান্তি প্রক্রিয়ার গতি বাড়তে পারে।
ভবিষ্যতে গাজার শান্তি বোর্ডের কার্যক্রম কীভাবে এগোবে, তা নির্ভর করবে প্রধান আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের সমন্বিত সিদ্ধান্তের উপর। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের সম্ভাবনা, ফ্রান্সের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারতের অংশগ্রহণের মাত্রা সবই গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গাজার শান্তি বোর্ডের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অফিস ইতিমধ্যে মাখোঁকে সরাসরি চিঠি পাঠানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে, যাতে শুল্কের হুমকি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে, বোর্ডের অন্যান্য সদস্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব অবদান ও দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, গাজার যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে গৃহীত ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগে ফরাসি প্রেসিডেন্টের অনাগ্রহের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি নতুন রাজনৈতিক গতিপথ তৈরি করেছে। এই চাপের ফলাফল গাজার শান্তি প্রক্রিয়ার সাফল্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে।



