আসাম-বঙ্গ লাইন সিস্টেমের সূচনা পূর্বের স্থানিক গতি, ভূমি ব্যবহার এবং পরিচয়ের গঠনকে কেন্দ্র করে একটি বহু-ধাপের বিশ্লেষণ। গঙ্গা‑ব্রহ্মপুত্র‑মেঘনা নদের বিস্তৃত জলাভূমি, বনের ছায়া এবং পাহাড়ের ছন্দে মানুষ জীবনের রূপান্তর ঘটাত। বন্যা, ফসলের মৌসুম, বাণিজ্যিক পথ এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম, পেশা, ভাষা ও ধর্মের স্তরে পরিচয় গড়ে উঠত।
উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চল পৃথিবীর অন্যতম পরিবর্তনশীল পরিবেশগত অঞ্চল। নদী নেটওয়ার্কের কারণে বারবার বন্যা, চর (নদীর দ্বীপ), জলে ঢাকা ভূমি এবং বনভূমি গঠিত হয়। এক প্রজন্মের মধ্যে জমি গলে যায়, নতুন সেডিমেন্ট নীচে জমা হয়, ফলে কৃষিকাজের জন্য নতুন ভূমি উদ্ভব হয়। এই প্রাকৃতিক চক্রে মানুষের বেঁচে থাকার কৌশলও পরিবর্তনশীল ছিল।
এই পরিবেশে স্থানান্তর কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এটি জীবনের স্বাভাবিক অংশ। নদীর পথ পরিবর্তন হলে কৃষক পরিবারগুলো নতুন জমিতে চলে যেত, মৎস্যজীবীরা পানির সঙ্গে সরে যেত, আর চাষিরা নতুন সেডিমেন্টে ক্ষেত তৈরি করত। এসব স্থানান্তরকে আধুনিক অর্থে ‘মাইগ্রেশন’ বলা হতো না; বরং এটি ডেল্টা অঞ্চলের স্বাভাবিক জীবনধারা।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, যা আজকের আসাম, বাঙালির ঘনবসতিপূর্ণ ডেল্টার তুলনায় কম জনসংখ্যার ছিল, তবু একই জলীয় ব্যবস্থা ভাগ করে নিত। নদীর প্রবাহ উভয় অঞ্চলকে সংযুক্ত করত, সীমা গঠন না করে পারস্পরিক সম্পদ ভাগাভাগি সহজ করত। ফলে মানুষ দু’প্রান্তে সহজে চলাচল করত।
ব্রিটিশ শাসনকালে ১৯২০-এর দশকের শুরুর দিকে ‘আসাম‑বঙ্গ লাইন সিস্টেম’ নামে একটি নীতি প্রণয়ন করা হয়। এই নীতি প্রায়ই দীর্ঘদিনের অভিবাসনের সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তবে বাস্তবে এটি ঔপনিবেশিক শাসন যে ভূমি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তার ফলস্বরূপ উদ্ভূত হয়। লাইন সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন কাঠামোর জন্য সীমা নির্ধারণ, না যে প্রকৃত মানবিক গতি থামানো।
লাইন সিস্টেমের প্রবর্তনের আগে, মানুষ নদীর স্রোতে, বন্যার পরিণামে এবং বাণিজ্যিক চাহিদায় স্বেচ্ছায় চলাচল করত। তবে শাসন কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত সীমা মানুষকে ঐতিহ্যবাহী গতি-প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে স্থানান্তরের অর্থ ও সামাজিক প্রভাব পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনই পরবর্তী সময়ে সামাজিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের ভিত্তি গড়ে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, আসাম‑বঙ্গ লাইন সিস্টেমের মাধ্যমে গৃহীত ভূমি নীতি কেবলমাত্র প্রশাসনিক সীমা নির্ধারণই নয়, বরং জনসংখ্যার গতি-প্রবাহকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করেছিল। ফলে পূর্বের স্বাভাবিক স্থানান্তরকে এখন নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্নে রূপান্তরিত করা হয়।
পরবর্তী দশকে এই সীমা-নির্ধারণের ফলে উভয় অঞ্চলের মধ্যে ভূমি অধিকার, শ্রমিকের অবস্থা এবং জাতিগত পরিচয়ের ওপর নতুন বিতর্ক উত্থাপিত হয়। লাইন সিস্টেমের প্রভাব আজও ভূমি নীতি, সীমান্ত সংক্রান্ত আলোচনায় এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
অত



