কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন আমাদের কাজের রুটিনে ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছে। ইমেইল পরিষ্কার করা, অনুচ্ছেদ অনুবাদ করা, প্রেজেন্টেশনের রূপরেখা তৈরি করা, রিপোর্টের খসড়া তোলা কিংবা পরবর্তী পদক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া—এইসব কাজগুলোতে AI ব্যবহার করা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের উপর প্রতিযোগিতা, সময় সাশ্রয় এবং পরিপাটি দেখানোর চাপের ফলে AI-কে সহকারী হিসেবে গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এই সুবিধা অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করলে আমাদের মৌলিক দক্ষতা ও মানবিক গুণাবলি ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।
AI-কে কাজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা মানে শুধু সফটওয়্যারের আপডেট নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনা। দ্রুত ফলাফল পেতে এবং অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে মানুষ AI-কে যতটা সম্ভব কাজে লাগাতে চায়। ইমেইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজানো, অনুবাদে এক ক্লিক, অথবা প্রেজেন্টেশনের স্লাইডের টেক্সট জেনারেট করা—এই সবই এখন এক ক্লিকের দূরত্বে। তবে এই দ্রুততা ও স্বাচ্ছন্দ্য যদি অতিরিক্ত হয়ে যায়, তবে কাজের গুণগত মান ও ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
AI সিস্টেমগুলো শুধুমাত্র গণনা করে না, তারা নতুন বিষয়বস্তু তৈরি করে, পরামর্শ দেয় এবং আমাদের চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ করে। ফলে কখনও কখনও এমন অনুভূতি হয় যে AI আমাদের কাজের গুণমান বাড়িয়ে দিচ্ছে, যদিও মূল চিন্তা প্রক্রিয়া ততটা গভীর নয়। এই ‘সফলতা’র ছদ্মবেশে মানুষ ভুলে যায় যে সত্যিকারের দক্ষতা হল সঠিক প্রশ্ন করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং ফলাফলের জন্য দায়িত্ব নেওয়া। যখন AI সবসময় প্রথম খসড়া সরবরাহ করে, তখন ব্যবহারকারী ধীরে ধীরে সেই প্রথম খসড়াকে চূড়ান্ত রূপে গ্রহণ করতে পারে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুণগত মানকে কমিয়ে দেয়।
বিবেচনা করা দরকার কখন AI ব্যবহার করা উচিত এবং কখন নিজে কাজ করা উচিত। এটি কোনো পুরনো সময়ের নস্টালজিয়া নয়, বরং বাস্তবিক প্রয়োজন যে কিছু কাজ শুধুমাত্র মানবিক বিচার ও অনুভূতি দিয়ে সম্পন্ন করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বার্তা রচনা, যুক্তি গঠন বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধুমাত্র ফলাফল নয়, প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ায় আমরা কী গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে তা গ্রহণযোগ্য হবে এবং তার পরিণতি কী হবে—এগুলো সবই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। AI যদি এই ধাপগুলোকে বাদ দিয়ে সরাসরি ফলাফল দেয়, তবে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিচারশক্তি দুর্বল হয়ে যায়।
AI-র অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের আত্মবিশ্বাসের ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি টেক্সটের স্বচ্ছন্দ স্বর ও আত্মবিশ্বাসের টোন কখনও কখনও ব্যবহারকারীকে ভুলভাবে বিশ্বাস করিয়ে দেয় যে কাজটি যথেষ্ট সঠিক। ফলে সত্যিকারের বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক চিন্তা কমে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত আমরা এমন একটি পরিবেশে বসে থাকি যেখানে ‘সঠিক শোনায়’ তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘সঠিক হওয়া’ নয়। এই প্রবণতা বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষেত্রের তরুণদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দ্রুত ফলাফলকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়।
সারসংক্ষেপে, AI আমাদের কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, তবে এর সঙ্গে মানবিক বিচার, সৃজনশীলতা এবং দায়িত্ববোধের বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় সচেতনভাবে সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। AI-কে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা, কিন্তু মূল সিদ্ধান্ত ও সৃজনশীল কাজগুলো নিজে করা—এটাই ভবিষ্যতে কর্মক্ষমতা ও মানবিক গুণাবলি দুটোই বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি। এই ভারসাম্য রক্ষা করলে AI আমাদের জীবনে সত্যিকারের উন্নতি আনবে, মানবিক দিককে ক্ষয় না করে।



