বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) তিন বছর ধরে নীতি সুদের হার ৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে বাড়িয়ে কঠোর আর্থিক নীতি চালু করেছে, তবে মুদ্রাস্ফীতি এখনও হ্রাস পাচ্ছে না। জুলাই ২০২৪-এ মুদ্রাস্ফীতির হার সর্বোচ্চ ১১.৬৬ শতাংশে পৌঁছায়, যা উচ্চতর ঋণ ব্যয়ের প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে।
গত বছর জুনে মুদ্রাস্ফীতি সাময়িকভাবে ৮.৪৮ শতাংশে নেমে আসে, যা দুই বছর পর প্রথমবার ৯ শতাংশের নিচে নামার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই স্বল্পস্থায়ী স্বস্তি দ্রুতই শেষ হয়ে ডিসেম্বর মাসে হার ৮.৪৯ শতাংশে ফিরে আসে, এবং পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পায়।
বিবি’র ১২ মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি এখন ৮.৭৭ শতাংশ, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই বাস্তবতা গভার্নর আহসান এইচ. মনসুরের পূর্বাভাসের বিপরীতে, যিনি ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি সত্ত্বেও তরলতা বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে। বিবি ব্যাংকগুলোর রেপো হার বাড়িয়ে ঋণ গ্রহণের খরচ বাড়িয়েছে, তবে একই সঙ্গে ব্যাংকিং সেক্টরে ৫০,০০০ কোটি টাকার বেশি তহবিল সাপোর্ট প্রদান করেছে, যাতে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে না যায়।
এর পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মার্কিন ডলার ক্রয় করে অতিরিক্ত ৪০,০০০ কোটি টাকা অর্থনীতিতে প্রবেশ করিয়েছে। এই দ্বৈত নীতি—একই সময়ে ঋণ ব্যয় বাড়ানো এবং তরলতা যোগ করা—নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি দমনকে কঠিন করে তুলেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও এক্স-চিফ ইকোনমিস্টের মতে, এই সমান্তরাল নীতি একটি বিরোধপূর্ণ চক্র তৈরি করেছে, যেখানে ঋণ ব্যয় বাড়লেও বাজারে অতিরিক্ত তহবিলের প্রবাহ মূল্যস্ফীতি দমনকে বাধা দেয়।
ফিস্কাল শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়াও মুদ্রা নীতির প্রভাবকে কমিয়ে দেয়। ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে ধীর হয়ে গিয়েছে, তবে নভেম্বর মাসে সরকারী ঋণ গ্রহণ ২৬.২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়িয়ে দেয়।
বাজারে এই পরিস্থিতি শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা ও রিয়েল এস্টেটের চাহিদায় প্রভাব ফেলছে। উচ্চতর সুদের হার সত্ত্বেও তরলতা বজায় থাকায় বন্ডের দাম কমে এবং রিটার্ন বাড়ছে, যা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি-সচেতন পোর্টফোলিও গঠনকে উৎসাহিত করছে।
মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা গ্রাহক মূল্যবোধে সরাসরি প্রভাব ফেলছে; খাদ্যদ্রব্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে গৃহস্থালি ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভোক্তা আত্মবিশ্বাস কমে এবং খুচরা বিক্রয় ধীর হতে পারে।
অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন দুটি বিকল্প স্পষ্ট: একদিকে মুদ্রা নীতি আরও কঠোর করে তরলতা হ্রাস করা, অথবা ফিস্কাল ঘাটতি কমিয়ে সরকারী ঋণ গ্রহণ সীমিত করা। উভয় দিকেই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে, যদি তরলতা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ না করা হয় এবং সরকারী ব্যয় বৃদ্ধি পায়, তবে মুদ্রাস্ফীতি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৯ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ, ঋণ গ্রহণ এবং ভোক্তা ব্যয়ের পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা বাড়াবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নীতি সত্ত্বেও মুদ্রাস্ফীতি স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যা নীতি সমন্বয়ের অভাব ও ফিস্কাল শৃঙ্খলার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য নীতি গৃহীতকারী সংস্থাগুলোর দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য, নতুবা মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ স্তরে স্থায়ী হয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।



