গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে; এখন দেশটি লন্ডন, সিঙ্গাপুর ও নিউ ইয়র্কের মতো আন্তর্জাতিক হাবের মতোই জটিল সাইবার হুমকির মুখে। এই পরিবর্তনটি কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সূচক নয়, বরং দেশের আর্থিক, টেলিকম, উৎপাদন ও সরকারি সেবা ক্ষেত্রগুলোতে অপরাধী গোষ্ঠী, হ্যাকটিভিস্ট ও রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিতও দেয়।
প্রথমদিকে বাংলাদেশে সাইবার আক্রমণ মূলত ফিশিং ইমেইল ও সহজ ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল; তবে এখন একই সময়ে সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ হ্যাকটিভিস্ট এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সমর্থিত হ্যাকাররা দেশের মূল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে। ব্যাংক, টেলিকম নেটওয়ার্ক, উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সরকারি প্ল্যাটফর্মগুলোতে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ার ফলে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের গতি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
এই উন্নয়নটি একদিকে দেশের প্রযুক্তিগত পরিপক্কতার প্রমাণ, অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা। পুরনো নিরাপত্তা কৌশল—যেমন ফায়ারওয়াল, অ্যান্টিভাইরাস এবং মাঝে মাঝে নিরাপত্তা অডিট—এখন আর যথেষ্ট নয়।
সিকিউরিটি ফার্ম Sophos-এর গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রমণকারী গড়ে মাত্র দুই দিনের মধ্যে সিস্টেমে প্রবেশ করে লুকিয়ে থাকে; এই সময়ের মধ্যে ডেটা চুরি, সেবা বিঘ্নিত করা বা র্যানসমওয়্যার স্থাপন করা সম্ভব। দুই দিনই একটি নিরাপত্তা ঘটনার বড় সংকটে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়।
বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও সাইবার নিরাপত্তাকে শুধুমাত্র আইটি বিভাগের কাজ হিসেবে দেখছে; এই দৃষ্টিভঙ্গি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। আক্রমণকারী যখন দুই দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা সেবা দখল করে নেয়, তখন ব্যবসার ধারাবাহিকতা ও গ্রাহকের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সাইবার রেজিলিয়েন্স—যা আক্রমণ প্রতিরোধ, দ্রুত সাড়া, অভিযোজন ও পুনরুদ্ধারকে একত্রে অন্তর্ভুক্ত করে—গড়ে তোলা জরুরি।
রেজিলিয়েন্স গড়ে তোলার জন্য পাঁচটি আন্তঃসংযুক্ত নীতি অনুসরণ করা উচিত: প্রথমে ব্যবসার ঝুঁকি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ, দ্বিতীয়ে বাস্তবসম্মত সুরক্ষা নীতি ও প্রযুক্তি প্রয়োগ, তৃতীয়ে রিয়েল-টাইম হুমকি পর্যবেক্ষণ, চতুর্থে ঘটনার দ্রুত সাড়া ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা, এবং শেষমেশ নিয়মিত পর্যালোচনা ও উন্নয়ন। এই নীতিগুলো একত্রে কাজ করলে আক্রমণকারীকে সিস্টেমে দীর্ঘ সময় লুকিয়ে থাকা কঠিন হয়ে যায়।
সাইবার হুমকি র্যান্ডম নয়; তারা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে, পরিচিত দুর্বলতাকে কাজে লাগায় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করে। তাই হুমকি ইন্টেলিজেন্স—যা বর্তমান আক্রমণ পদ্ধতি, ব্যবহার করা টুল ও কৌশল সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করে—অনুসরণ করা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়।
যেসব সংস্থা কেবল ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়া জানায়, তারা সর্বদা এক ধাপ পিছিয়ে থাকে। বিপরীতে, হুমকি তথ্যের ধারাবাহিক আপডেট ও বিশ্লেষণ করে সিস্টেমের দুর্বলতা দ্রুত সনাক্ত করা সম্ভব, যা আক্রমণকারীকে বাধা দেয়।
একটি নিরাপত্তা সতর্কবার্তা নিজে থেকেই যথেষ্ট নয়; তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম, সংবেদনশীল ডেটা বা অপরিহার্য সেবাকে প্রভাবিত করে তা মূল্যায়ন করা দরকার। ব্যবসার অগ্রাধিকার, নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগস্থল স্পষ্টভাবে বোঝা ছাড়া কোনো সতর্কবার্তা কার্যকর হয় না।
সুতরাং, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই সাইবার নিরাপত্তাকে ব্যবসার কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। হুমকি ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার, রেজিলিয়েন্স নীতি বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ একত্রে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা গড়ে তুলবে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে নিরাপদ ও টেকসই করে তুলবে।



