বাংলাদেশের সরকার সুতার বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহার করে ১০ থেকে ৩০টি জেলার আমদানি শুল্কে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছে, যা দেশের বস্ত্র ও নিট পোশাক শিল্পে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এই পদক্ষেপের পেছনে ভারত ও বাংলাদেশের স্পিনিং খাতের উৎপাদন ব্যয়ের পার্থক্য ও মূল্য গঠনকে সমন্বয় করা বলা হচ্ছে।
ভারতীয় সুতার দাম সবসময়ই দেশের নিজস্ব সুতার তুলনায় ২০ থেকে ২৫ সেন্ট বেশি ছিল। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ এবং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচও বাড়ছে। তদুপরি, সরকার নগদ সহায়তা ১.৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে, যা মূল্যের ফাঁক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিকেএমইএর প্রাক্তন সভাপতি ফজলুল হক উল্লেখ করেন, বস্ত্র খাতের অদক্ষতা নিয়ে দায়িত্ব আমাদের নয়; বন্ড‑সুবিধা বাতিল করলে সুতার মালিকদের একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ হবে এবং তারা যে দামে সুতার সরবরাহ করবে, তা কিনতে হবে। গ্লোবাল ফ্যাশন বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে এই সিদ্ধান্ত বুদ্ধিদীপ্ত নয় বলে তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।
সমস্যা সমাধানের বর্তমান পদ্ধতি যৌক্তিক নয়, সরকারকে স্বতন্ত্র সংস্থার মাধ্যমে সমীক্ষা করে নীতি নির্ধারণ করা উচিত, এই মতামত সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোতে ভারতীয় উৎপাদকরা সরকারী সহায়তা পেয়ে ২ ডলার ৫০ সেন্ট থেকে ২ ডলার ৬০ সেন্ট প্রতি কেজি দরে সুতা রপ্তানি করে, যেখানে দেশের উৎপাদকরা দক্ষতা বাড়াতে পারছেন না।
মন্ত্রণালয়ের যুক্তি অনুযায়ী, ভারত ও বাংলাদেশের স্পিনিং মিলের মোট উৎপাদন ব্যয় প্রতি কেজি প্রায় ২ ডলার ৯৩ সেন্ট। তবে পার্শ্ববর্তী দেশের উৎপাদকরা বিভিন্ন প্রণোদনা পেয়ে বাংলাদেশে কম দামে রপ্তানি করতে সক্ষম, যা দেশীয় শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিটিএমএর একজন নেতা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন যে সংগঠনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দ্রুত বন্ড‑সুবিধা বাতিলের সুপারিশকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের পেছনে শিল্পের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা বেশি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, সুতা ও নিট পোশাক দেশের দুইটি প্রধান শিল্প, এবং স্থানীয় মিলগুলো সুতা উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এই সক্ষমতা হারিয়ে গেলে শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে, তাই তিনি ন্যাশনাল বাণিজ্য রেজিস্ট্রির (এনবিআর) মাধ্যমে বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন।
মহবুবুরের মতে, এই প্রস্তাবের পেছনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই; পোশাক শিল্পের মালিকদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বন্ড‑সুবিধা চার দশক ধরে রপ্তানিকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা ছিল, বিশেষ করে নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য।
বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহার হলে ভারতসহ অন্যান্য দেশের সুতা রপ্তানি কমে যাবে, যা দেশের আমদানি ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে একই সঙ্গে, স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারীরা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, যদি সরকার দ্রুত বন্ড‑সুবিধা বাতিল করে, তবে সুতা মিলগুলো আর্থিক সংকটে পড়তে পারে, যা কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় দুটোই হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে। তাই নীতি নির্ধারণে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং শিল্পের প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, সুতার বন্ড‑সুবিধা প্রত্যাহার পরিকল্পনা মূলত মূল্য পার্থক্য কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে, তবে বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও সময়সূচি নিয়ে শিল্পের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। সরকারকে স্বতন্ত্র গবেষণা ও পরামর্শের ভিত্তিতে সমন্বিত নীতি গঠন করতে হবে, যাতে বস্ত্র ও নিট পোশাক খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়।



