জাপানের নারা শহরের একটি আদালতে বুধবার (২১ জানুয়ারি) শিনজো আবে হত্যার প্রধান সন্দেহভাজনকে আজীবন কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। রায়টি ২০২২ সালের জুলাই মাসে ঘটিত গুলিবর্ষণের পর প্রায় তিন বছর পর প্রকাশিত হয়েছে।
বিচারক শিনিচি তানাকা রায়ে উল্লেখ করেছেন যে অভিযুক্ত তেতসুয়া ইয়ামাগামি গুলিবর্ষণের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি জড়িত ছিলেন। আদালতে তার বয়স ৪৫ বছর এবং তিনি নিজে স্বীকার করেছেন যে আবে হত্যার পেছনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল।
২০২২ সালের জুলাই মাসে শিনজো আবে, যিনি ৩,১৮৮ দিন জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পাবলিক ইভেন্টে গুলি হয়ে নিহত হন। এই ঘটনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্ময় ও শোকের স্রোত তৈরি করে, কারণ জাপানে বন্দুক সহিংসতা খুবই বিরল।
প্রসিকিউশন দল এই হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধোত্তর ইতিহাসের অনন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায়। তারা যুক্তি দেয় যে গুলিবর্ষণের পেছনে আবে এবং ইউনিফিকেশন চার্চের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতি বিরোধী মতামত ছিল।
ইয়ামাগামি আদালতে বলেছিলেন যে তিনি আবে হত্যার পরিকল্পনা করেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন আবে ঐ ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি দাবি করেন যে এই কাজের মাধ্যমে তিনি জনসাধারণের দৃষ্টি সেই সংগঠনের কর্মকাণ্ডের দিকে আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন।
প্রসিকিউশন আরও উল্লেখ করে যে অভিযুক্তের উদ্দেশ্য ছিল আবে মত প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নির্মূল করে ধর্মীয় গোষ্ঠীর কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা। এধরনের উদ্দেশ্যকে বিচারিক দৃষ্টিতে ‘অসাধারণ অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
জাপানের আইন অনুসারে আজীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দোষীকে নির্দিষ্ট শর্তে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে অধিকাংশ আজীবন দণ্ডপ্রাপ্ত কেসে দোষীরা কারাগারে শেষ জীবনের দিন কাটায়।
ইয়ামাগামির আইনজীবীরা তার পরিবারের আর্থিক কষ্টের কথা তুলে ধরে ২০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন করেন, তবে আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি বজায় রাখে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং ইউনিফিকেশন চার্চের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। পার্টির অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রকাশ পায় যে শতাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঐ সংগঠনের লেনদেনের রেকর্ড রয়েছে।
এই তথ্যের প্রকাশ জাপানি ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক রাগের সঞ্চার ঘটায় এবং দীর্ঘদিন ধরে শাসনরত এলডিপির জনপ্রিয়তায় উল্লেখযোগ্য হ্রাসের সূচনা করে।
শিনজো আবে, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, তার মৃত্যুর পর জাপানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। তার উত্তরসূরি ও বর্তমান পার্টি নেতা সানা তাকাইচি এখন পার্টির নেতৃত্বে আছেন, তবে জনমত তার প্রতি পূর্বের তুলনায় কম সমর্থন দেখাচ্ছে।
আসন্ন সময়ে ইয়ামাগামি রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সম্ভাবনা রয়েছে, এবং আদালতকে অতিরিক্ত প্রমাণ বা আইনি পয়েন্ট পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে, ইউনিফিকেশন চার্চের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগের উপর আরও গভীর তদন্তের দাবি বাড়ছে।
এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানি সমাজে ধর্মীয় সংগঠন ও রাজনীতির সীমা নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে, এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সংবেদনশীলতা বজায় রেখে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।



