হোয়াইট হাউসে মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) প্রেস কনফারেন্সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠন ও বৈশ্বিক শান্তি তদারকির জন্য তার প্রস্তাবিত “বোর্ড অব পিস”কে ভবিষ্যতে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে বলে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তি দেন, জাতিসংঘ দীর্ঘ সময় ধরে তার প্রত্যাশিত কার্যকারিতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে নতুন সংস্থা ঐ শূন্যতা পূরণে সক্ষম হবে।
সিএনএন সূত্রে জানানো হয়েছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী বোর্ডের চার্টারে তিনি আজীবনের জন্য চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। এই শর্তের ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের স্রোত সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে চলমান শুল্ক ও গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে।
হোয়াইট হাউস গত শুক্রবার এই বোর্ডের জন্য একটি “প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ড” গঠন করেছে। এতে ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, মার্কো রুবিও (মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী), বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার অন্তর্ভুক্ত। খসড়া সনদে স্পষ্ট করা হয়েছে, ট্রাম্প এই বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে অনির্দিষ্টকালীনভাবে থাকবেন, এবং কেবল তখনই পদত্যাগের মাধ্যমে বা নির্বাহী বোর্ডের সর্বসম্মত ভোটে শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা প্রমাণিত হলে তিনি অপসারিত হবেন।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হলেও বোর্ডে তার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে, এবং ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার সঙ্গে সমন্বয় করে নিজস্ব প্রতিনিধি নিয়োগের অনুমতি পাবে। এই শর্তটি বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বজায় রাখার উদ্দেশ্য নির্দেশ করে।
বোর্ডের সদস্যপদ গ্রহণের মানদণ্ড এবং আমন্ত্রিত দেশের তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক উন্মোচিত হয়েছে। রাশিয়া, চীন এবং বেলারুশের মতো দেশকে এই শান্তি সংস্থায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার সাফ উল্লেখ করেন, যেসব দেশ বর্তমানে সংঘাতে জড়িত, তাদের “শান্তি” শব্দযুক্ত কোনো সংস্থায় অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।
বোর্ডের স্থায়ী আসন পেতে দেশগুলোকে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান প্রদান করতে হবে বলে শর্ত নির্ধারিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই তহবিল গাজা পুনর্গঠন প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে, যদিও তহবিলের প্রকৃত ব্যবহার ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার কাঠামোতে নতুন এক ধাপের সূচনা হতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি বিদ্যমান বহুপাক্ষিক সংস্থার কার্যকারিতা ও বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। বিশেষ করে, জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা বিবেচনা করলে, নতুন সংস্থার স্বীকৃতি ও কার্যক্রমের জন্য ব্যাপক সমর্থন অর্জন করা সহজ হবে না।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে কিছু মিত্র দেশ নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের স্থিতিশীলতা হুমকিরূপে দেখছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, গ্লোবাল শান্তি বজায় রাখতে বিদ্যমান সংস্থার সংস্কারই যথাযথ পথ, নতুন সংস্থার সৃষ্টির চেয়ে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকরা যুক্তি দেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না করা হলে গ্লোবাল সংকটের সমাধান কঠিন হয়ে পড়বে। তারা বিশ্বাস করে, ট্রাম্পের বোর্ড গাজা পুনর্গঠন ও অন্যান্য সংঘাতময় অঞ্চলে দ্রুত হস্তক্ষেপের জন্য একটি কার্যকর মঞ্চ সরবরাহ করবে।
পরবর্তী ধাপ হিসেবে, ট্রাম্পের দল বোর্ডের চূড়ান্ত চার্টার প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমোদন চাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের তদারকি ও তহবিলের ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্টতা নিশ্চিত করার জন্য আলোচনাও চালু থাকবে।
এই উদ্যোগের ফলাফল কী হবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গাজা পুনর্গঠন, বিশ্ব শান্তি তদারকি এবং বহুপাক্ষিক সংস্থার ভূমিকা পুনর্নির্ধারণের এই প্রস্তাবনা, ভবিষ্যতে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা সময়ই প্রকাশ করবে।



