আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ২১ জানুয়ারি বুধবার, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আবুল কালাম আজাদ আত্মসমর্পণ করেন। তিনি পূর্বে দায়ের করা এক আবেদন অনুযায়ী, সাজা স্থগিতের অনুরোধ করে ছিলেন এবং তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দিয়েছিলেন। আত্মসমর্পণের সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের হিয়ারিং রুমে উপস্থিত হয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার অধীন হয়েছেন।
আবুল কালাম আজাদ গত বছর একই মন্ত্রণালয়ে সাজা স্থগিতের আবেদন দাখিল করছিলেন, যা ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৪০১ অনুসারে করা হয়। এই ধারা অনুযায়ী, দণ্ডের কার্যকরতা স্থগিতের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। আবেদনটি দাখিলের পরেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি বিচারিক পর্যায়ে অগ্রসর হয়।
তার বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑২ রায় প্রদান করে। রায়ের সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, যিনি মামলাটির মূল দিকগুলো বিশ্লেষণ করেন। রায়ে উল্লেখ করা হয় যে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল, যার মধ্যে সাতটি প্রমাণিত হয়েছে।
প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৪ জনের হত্যা, তিনজন নারীর ধর্ষণ, নয়জনের অপহরণ এবং দশজনের আটক রাখা। এছাড়াও পাঁচটি বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ঘটানো এবং পনেরোটি বাড়ি থেকে সম্পদ লুটের অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। অপর একটি অভিযোগের প্রমাণ না থাকায় তা বাদ দেওয়া হয়।
প্রমাণিত সাতটি অভিযোগের ভিত্তিতে তিনটি মৃত্যুদণ্ড এবং চারটি কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় বাকি চারটি দণ্ড আলাদাভাবে ঘোষিত হয়নি। রায়ের সময় আবুল কালাম আজাদ পলাতক অবস্থায় থাকায় তাকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
এই রায়টি যুদ্ধাপরাধের মামলায় প্রথমবারের মতো চূড়ান্ত রায় হিসেবে স্বীকৃত হয়। রায়ের পরেও তার উপস্থিতি না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সূত্র অনুযায়ী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগে তিনি ভারত দিয়ে পাকিস্তানে পলায়ন করেন।
২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তি-প্রতিবাদ শেষ হওয়ার পর, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। এরপর আদালত মামলাটিকে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) অবস্থায় রাখে। এই পর্যায়ে রায়ের অপেক্ষা করার সময় আদালত অতিরিক্ত কোনো দণ্ড ঘোষণা করেনি।
আবুল কালাম আজাদের আত্মসমর্পণের পর, ট্রাইব্যুনাল তাকে আইনগতভাবে আটক করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বর্তমানে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কারাগারে স্থানান্তর করা হবে এবং পরবর্তী শুনানির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে আরোপিত মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরতা ও বাকি দণ্ডের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো আদালত নির্ধারণ করবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, আত্মসমর্পণের আগে তিনি ভারত ও পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় নেন, ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তার মামলার রায় প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে বহু পর্যায়ে বিতর্ক ও আলোচনা চালিয়ে এসেছে। রায়ের সময় উল্লিখিত প্রমাণ ও সাক্ষ্যগুলোকে ভিত্তি করে আদালত তার বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তি নির্ধারণ করেছে।
এখন থেকে ট্রাইব্যুনাল তার আত্মসমর্পণের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া, যার মধ্যে আপিলের সম্ভাবনা ও শাস্তির বাস্তবায়ন অন্তর্ভুক্ত, সেসব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, ভবিষ্যতে এমন ধরনের পলাতক অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই আত্মসমর্পণ যুদ্ধাপরাধের শিকারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত বহন করে, যা বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে, ভবিষ্যতে অনুরূপ অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।



