ইতালির প্রতিরক্ষা অধিনির্বাহী ম্যাটেও পেরেগো দি ক্রেমনাগো গতকাল ঢাকার স্টেট গেস্ট হাউস জামুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং জুলাই মাসে প্রস্তাবিত চার্টার সংস্কারকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন।
বৈঠকটি দু’পক্ষের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনার মঞ্চ তৈরি করে, যেখানে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অভিবাসন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন এবং জুলাই চার্টারসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়।
ইউরোপীয় দেশের দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাই চার্টারকে প্রশংসা করে পেরেগো উল্লেখ করেন যে, এতে উল্লেখিত ব্যাপক সংস্কারগুলো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রোমের পক্ষ থেকে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
ইন্দো‑প্যাসিফিককে বিশ্বজনীন কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করে পেরেগো জানান, ইতালি এই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষত বাংলাদেশের সঙ্গে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার ইচ্ছা পোষণ করে। তিনি বাংলাদেশের দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিকে উল্লিখিত করে দু’দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
ইতালিতে বসবাসকারী বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সংহতি ও সমন্বয়কে ইতালি প্রশংসা করে, তবে ভূমধ্যসাগরীয় পথে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই উদ্বেগের সমাধানে বৈধ অভিবাসন পথের সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তিনি উল্লেখ করেন।
বৈঠকে ইউনুস ইতালির সঙ্গে তার দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন, তিনি অস্থায়ী সরকার গঠনের আগে এই বছর অনুষ্ঠিত মিলানো‑কোর্টিনা শীতকালীন অলিম্পিককে সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করতে সহায়তা করেছেন।
ইউনুস আরও জোর দিয়ে বলেন, জাপান ও ইতালির মতো বয়স বাড়তে থাকা দেশগুলোতে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণে বৈধ অভিবাসনকে বাড়িয়ে তোলা জরুরি। তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের তরুণ কর্মশক্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে ইউনুস জানান, আসন্ন ভোটকে “উৎসবমুখর” এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহৎ পর্যবেক্ষক দলকে প্রশংসা করে বলেন, তাদের উপস্থিতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াবে।
ইউনুসের মতে, তরুণ প্রজন্মের ভোটগ্রহণে অংশগ্রহণের হার উচ্চ হবে, কারণ গত ১৬ বছর ধরে তারা “নকল নির্বাচন” হিসেবে বিবেচিত প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেনি। এইবারের ভোটকে তিনি দেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ইতালির সমর্থন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক দলের উপস্থিতি এবং ইতালির রাজনৈতিক সমর্থন নির্বাচনের বৈধতা বাড়িয়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক চুক্তির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, বৈধ অভিবাসন প্রসারের ওপর ইতালির জোর দু’দেশের শ্রমবাজারে নতুন গতিবিধি আনতে পারে।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে তোলার জন্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দেন। ইতালি এবং বাংলাদেশ উভয়ই ইন্দো‑প্যাসিফিকের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানবিক বিষয়গুলোতে সমন্বিতভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথে প্রভাব ফেলবে।



