গাজা শহরে ২০২৪ সালে সংঘটিত বোমাবর্ষণের মাঝখানে ছয় বছর বয়সী হিন্দ রজাবের জরুরি ফোন কলের রেকর্ডিং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা কৌথের বেন হানিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টিউনিশিয়ার দুইবার অস্কার মনোনীত বেন হানিয়া এই রেকর্ডিংকে কেন্দ্র করে একটি ডকুমেন্টারি-ড্রামা তৈরি করেন, যা গত শুক্রবার যুক্তরাজ্যের সিনেমা হলগুলোতে প্রদর্শিত হয়।
হিন্দ রজাবের কণ্ঠে শোনা যায়, “তারা আমাকে গুলি করছে। দয়া করে আমাকে বাঁচিয়ে নিন, আমি ভয় পাচ্ছি।” এই রেকর্ডিংটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেন হানিয়া জানান, তিনি তৎক্ষণাৎ তার পূর্ব পরিকল্পিত চলচ্চিত্রের কাজ থামিয়ে এই গল্পটি তুলে ধরতে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তার দায়িত্ব আছে এমন কণ্ঠস্বরকে বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার।
বর্ণনা অনুসারে, হিন্দ এবং তার পরিবার গাজা শহরের এক এলাকায় বোমা হামলার সময় গাড়ি চালিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। গাড়িটি সন্দেহজনকভাবে ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গুলিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং হিন্দের সঙ্গে তার চাচা, চাচি এবং কয়েকজন আত্মীয় নিহত হয়। একই সময়ে, ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থেকে সাহায্য চাওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সও একই স্থানে শেলিংয়ের শিকার হয়ে পুরো দল মারা যায়।
প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায় যে তাদের কোনো সৈন্য ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না। তবে ফোরেনসিক আর্কিটেকচার, ইয়ারশট এনজিও এবং আল জাজিরা সাংবাদিকদের যৌথ তদন্তে দেখা যায় গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সের ক্ষতি ইসরায়েলি ট্যাঙ্কের গুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ফলাফলগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়।
গাজা অঞ্চলে চলমান দুই বছরের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সংযুক্ত জাতির নিরাপত্তা পরিষদে গাজা নাগরিকদের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়ে বেশ কয়েকটি দেশ আলোচনা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও মানবিক আইনের প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা জোর দেন।
একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, হিন্দের কণ্ঠস্বরের নথিকরণ গাজা সংঘাতের মানবিক দিককে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, এমন ডকুমেন্টারিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় এবং কূটনৈতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করে।
ডকুমেন্টারিটি “দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজাব” শিরোনামে তৈরি হয়েছে এবং ইতিমধ্যে অস্কার প্রার্থী তালিকায় স্থান পেয়েছে। বেন হানিয়া জানান, এই কাজটি তার নিজের অক্ষমতার অনুভূতি কাটিয়ে উঠতে এবং শিকারদের কণ্ঠস্বরকে নথিভুক্ত করতে একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, কাজটি না করলে তিনি নিজেকে সহিংসতার প্রতি অনিচ্ছাকৃতভাবে সমর্থনকারী হিসেবে বিবেচনা করতেন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর তদন্তের দাবি জানায়। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো গাজা অঞ্চলে চিকিৎসা সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি আহ্বান জানায়।
চলচ্চিত্রের প্রকাশের পর থেকে বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসব ও মানবাধিকার সমাবেশে এই কাজটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় চলচ্চিত্র উৎসবে এটি বিশেষ স্ক্রিনিং পায় এবং মানবিক ন্যায়বিচার নিয়ে প্যানেল আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
গাজা সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগগুলোকে একটি সেতু হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সংঘাতের মানবিক দিককে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে সাহায্য করে। বেন হানিয়ার কাজটি কেবল এক শিশুর কণ্ঠস্বরকে সংরক্ষণই নয়, বরং আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি নৈতিক স্মারক হিসেবেও কাজ করে।
সামগ্রিকভাবে, হিন্দ রজাবের কণ্ঠস্বরের নথিকরণ এবং তার পরবর্তী চলচ্চিত্রিক উপস্থাপন গাজা সংঘাতে মানবিক ক্ষতির পরিমাণকে স্পষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। এই ঘটনা এবং তার নথিকরণ ভবিষ্যতে গাজা ও ফিলিস্তিনের শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।



