মিজানুর রহমান, জুরাইন জেলার বাসিন্দা, তার ৬ বছর বয়সী মেয়ে মৃণ্ময়ী হৃদয়কে ২০১৮ সাল থেকে ছয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা খরচে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এলাকার নাগরিক সেবার অভাবের কারণে তিনি দীর্ঘদিনের অসন্তোষে আছেন।
২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি এক অনন্য প্রতিবাদ পরিচালনা করেন। জুরাইন থেকে কাচের জগে পানি, চিনি, লেবু ও ছুরি নিয়ে তিনি ঢাকার কারওয়ান বাজারের ওয়াসা ভবনে গিয়ে ওয়াসা কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে শারবত দিয়ে পানির গুণগত মানের সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এই প্রতিবাদে তিনি ‘ওয়াসা মিজান’ নামে পরিচিতি পেয়ে যান এবং স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। একই বছর তিনি ঢাকা‑৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। তবে প্রাথমিকভাবে তার মনোনয়ন বাতিল হয়, পরে ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির শেষ দিনে তার প্রার্থিতা পুনরুদ্ধার করা হয়।
মঙ্গলবার সকালে মিজানুর রহমান আবারও কারওয়ান বাজারে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জল সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে উপস্থিত হন। তবে ওয়াসা কর্মকর্তারা পুরো দিন মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি সরাসরি কোনো সমাধান পেতে পারেননি।
ওয়াসা ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথম আলো সংবাদপত্রের অফিসে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, জল প্রতিবাদে তার নামের আগে ‘ওয়াসা মিজান’ যোগ হওয়ায় তিনি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন।
২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি গবেষণায় প্রকাশ করে যে ঢাকা ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানযোগ্য করে তোলেন, যার মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহক পানি ফুটিয়ে পান করেন।
সেই সময়ের ওয়াসা ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাকসিম এ খান দাবি করেন যে ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয়। মিজানুরের শারবত-প্রতিবাদে তিনি এই দাবির বিরোধিতা করে বলেন, নোংরা পানি দিয়ে শারবত পরিবেশন করা অনুচিত। খান মিজানুরের ওপর ‘মাথায় একটু গোলমাল আছে’ এমন মন্তব্য করেন।
মিজানুরের নির্বাচনের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত বছরের শেষ দিকে গ্যাস সংকট নিয়ে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাগে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি কাউন্সিলর, এমপি?’ এই প্রশ্ন তাকে রাজনৈতিক পথে অগ্রসর হতে উদ্বুদ্ধ করে।
মঙ্গলবারের তার কাজের তালিকায় তিতাস গ্যাসের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে সাক্ষাৎও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি প্রথম আলোকে জানান, তিনি ঢাকা‑৪ এলাকার ভুক্তভোগী, অধিকারহীন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছেন।
মিজানুরের দাবি অনুযায়ী, জুরাইন ও আশেপাশের এলাকায় মৌলিক সেবা, বিশেষত পরিষ্কার পানির সরবরাহ ও গ্যাসের সঠিক বিতরণে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। তিনি এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানান।
প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক প্রচারণার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। তার অনুসরণে জুরাইন ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা হয়েছে, যারা পানির গুণগত মান পরীক্ষা ও গ্যাস লিকেজের রিপোর্ট সংগ্রহ করে।
মিজানুরের স্বতন্ত্র প্রার্থিতা এবং তার প্রতিবাদমূলক পদ্ধতি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আগামী নির্বাচনে তার পারফরম্যান্স কীভাবে হবে, তা দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।



