ওয়াশিংটন থেকে মঙ্গলবার প্রেসব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফরাসি মদ, বিশেষত ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল মাক্রোঁকে “শান্তি বোর্ড”ে যোগ দিতে চাপ দেন। ট্রাম্পের মতে, শুল্ক না আরোপ করলে মাক্রোঁর এই উদ্যোগে অংশগ্রহণের ইচ্ছা কমে যাবে, যদিও তিনি সরাসরি বাধ্যতামূলক কোনো শর্ত উল্লেখ করেননি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই মাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানিয়েছেন যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট প্রথমে গাজা অঞ্চলের সংঘাত সমাধানে মনোযোগী একটি বোর্ড গঠন প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তবে এখন তিনি এই বোর্ডে যোগদানের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের দিকে ঝুঁকছেন। সহযোগী উল্লেখ করেন, মাক্রোঁর মূল লক্ষ্য হল জাতিসংঘের ভূমিকা বজায় রাখা, যা তিনি নতুন বোর্ডের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখছেন।
মাক্রোঁ বর্তমানে সুইস ডাভোসের অর্থনৈতিক ফোরামে অংশগ্রহণ করছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করার আগে প্যারিসে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভ্রমণসূচি অনুযায়ী, তিনি ডাভোস থেকে বেরিয়ে প্যারিসে পৌঁছানোর পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো সরাসরি মিটিংয়ের সম্ভাবনা কম।
ট্রাম্পের অফিসিয়াল বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি মাক্রোঁর একটি ব্যক্তিগত বার্তা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন, যেখানে মাক্রোঁ গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালা সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং তার কার্যক্রমকে সমালোচনা করেছেন। এই প্রকাশনা উভয় দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ফরাসি মদ ও স্পিরিটের সর্ববৃহৎ বাজার হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরিত ওয়াইন ও শ্যাম্পেনের মোট মূল্য প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। এই বৃহৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর বর্তমানে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপিত রয়েছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি নীতির অংশ।
ফরাসি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সংস্থাগুলি শুল্ক হ্রাসের জন্য লবিং চালিয়ে আসছে, যাতে শূন্য শুল্কের লক্ষ্য অর্জন করা যায়। তবে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক হুমকি শিল্পের বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, বিশেষত ছোট ও মাঝারি মদ প্রস্তুতকারকদের জন্য।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পরপরই শ্যাম্পেনের প্রধান উৎপাদক এলভিএমএইচ (LVMH) এর শেয়ার প্রায় দুই শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা বাজারে শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাবের প্রতি উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শুল্ক বৃদ্ধি হলে ফরাসি মদ রপ্তানির লাভজনকতা হ্রাস পাবে এবং রপ্তানি পরিমাণ কমে যেতে পারে।
ফ্রান্সের কৃষি মন্ত্রী অ্যানি জেনেভার্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিকে “নিষ্ঠুর” এবং “ব্ল্যাকমেইল” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোকে একত্রে এই ধরনের চাপের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান, যাতে ফরাসি রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।
রয়টার্সের হাতে আসা মার্কিন প্রশাসনের খসড়া নথি অনুসারে, “শান্তি বোর্ড”ের সদস্য হতে ইচ্ছুক দেশগুলোকে একশো একশো কোটি ডলার নগদ অর্থ প্রদান করতে হবে, যদি তারা তিন বছরের বেশি সময়ের জন্য সদস্যপদ বজায় রাখতে চায়। এই আর্থিক শর্তটি বোর্ডের কার্যক্রমকে আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্য নির্দেশ করে।
ট্রাম্প প্রথমবার এই শান্তি বোর্ডের ধারণা প্রকাশ করেন সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ, যখন গাজা অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। তখন তিনি আন্তর্জাতিক সংঘাতের সমাধানে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ষাটটি দেশের কাছে খসড়া চুক্তি পাঠায়।
ফরাসি সরকার ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি নির্ধারকরা এখন ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির প্রতিক্রিয়ায় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে। শুল্কের সম্ভাব্য প্রয়োগ ফরাসি-আমেরিকান সম্পর্কের উপর চাপ বাড়াতে পারে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগের স্বীকৃতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যদি ট্রাম্পের শুল্ক বাস্তবায়িত হয়, তবে ফরাসি মদ রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং ফরাসি উৎপাদকদের বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে, মাক্রোঁর শান্তি বোর্ডে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমঝোতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।



