আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য উপমন্ত্রী মৌলভি আহমাদুল্লাহ জাহিদ, প্রথমবারের মতো ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে উপস্থিত হন। সফরকালে তিনি সরকারি স্তরে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন, যার মূল লক্ষ্য দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক লাভ বৃদ্ধি করা।
সোমবার জাহিদ মেলায় উপস্থিত হয়ে প্রদর্শনী স্টল পরিদর্শন করেন এবং দুদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে একটি আলোচনা সেশনে যোগ দেন। এই সেশনে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা বর্তমান বাণিজ্যিক প্রবাহ, সম্ভাব্য রপ্তানি‑ইম্পোর্ট পণ্য এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো তুলে ধরেন।
মঙ্গলবার আফগান বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের স্তর থেকে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে অগ্রসর হতে সম্মত হয়েছে। উভয় দেশ বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি, পারস্পরিক আস্থা দৃঢ় করা এবং বাস্তবিক অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে উক্তি প্রকাশিত হয়।
রবিবারের বৈঠকে বাংলাদেশ বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস‑চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ আফগান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেন। এই বৈঠকে দুদেশের বাণিজ্যিক কাঠামো, শুল্ক নীতি এবং বাজার প্রবেশের বাধা দূর করার উপায়গুলো বিশদভাবে আলোচনা করা হয়।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা, বিশেষ করে কৃষি পণ্য, টেক্সটাইল এবং ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। উভয় পক্ষই দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ ও চিকিৎসা পণ্য সরবরাহের জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুত বলে জানায় এবং দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তি স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করে। এতে দুদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়ন এবং রোগীর সেবা মানোন্নয়নে সহায়তা পাওয়া যাবে।
বুধবার জাহিদের কর্মসূচিতে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালসের কারখানা পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত। এই সফরের মাধ্যমে দুদেশের ফার্মা শিল্পের প্রযুক্তিগত মান, উৎপাদন ক্ষমতা এবং গুণগত মানের তুলনা করা হবে, যা ভবিষ্যৎ রপ্তানি চুক্তির ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সফর দুদেশের বাণিজ্যিক পরিসরকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করার সম্ভাবনা তৈরি করে। বাংলাদেশ তার টেক্সটাইল, চা, জুটের পণ্য এবং ফার্মাসিউটিক্যালসের রপ্তানি বৃদ্ধি পেতে পারে, আর আফগানিস্তান উচ্চমানের ওষুধ, গৃহস্থালী পণ্য এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বাংলাদেশি সরবরাহকারীকে পছন্দের অংশীদার হিসেবে দেখতে পারে।
তবে এই সহযোগিতার পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, পেমেন্ট মেকানিজমের স্বচ্ছতা এবং লজিস্টিক্সের জটিলতা দুদেশের বাণিজ্যিক লেনদেনকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া শুল্ক নীতি ও কাস্টমস প্রক্রিয়ায় সমন্বয় না হলে রপ্তানি‑ইম্পোর্টের খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ব্যবসায়িক স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করবে।
সারসংক্ষেপে, আফগান শিল্প ও বাণিজ্য উপমন্ত্রী জাহিদের ঢাকা সফর দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল এবং কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য রপ্তানি‑ইম্পোর্টের পরিসর বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নিশ্চিত করতে পেমেন্ট, শুল্ক এবং লজিস্টিক্সের কাঠামোকে সুদৃঢ় করা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো দুদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে টেকসই এবং পারস্পরিক লাভজনক করে তুলবে।



