মধ্য-১৯৮০-এর দশকে, কিউবায় বসবাসরত ৩৯ বছর বয়সী কিউবান-আমেরিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ রজার ডুলি, স্প্যানিশ বাইজ্যান্টাইন নথিপত্রের গুহায় লুকিয়ে থাকা একটি নৌকায় লুকিয়ে থাকা ধনসম্পদের সূত্র খুঁজে পান। তিনি কিউবার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সমুদ্র সম্পদ অনুসন্ধান সংস্থা ক্যারিসাবের জন্য কাজ করছিলেন, যা ফিদেল কাস্ট্রোর উদ্যোগে সমুদ্রের নিচে ডুবে থাকা স্প্যানিশ জাহাজ থেকে ধন আহরণে নিয়োজিত।
ডুলি যখন ঐ আর্কাইভের ছাদে ঝুলন্ত গম্বুজের নিচে কাজ করছিলেন, তখন তিনি এমন কিছু নথি আবিষ্কার করেন, যেগুলো সান জোসে নামের গ্যালিয়নের দিকে ইঙ্গিত করে। সান জোসে ১৭০৮ সালে কলম্বিয়ার উপকূলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের সময় ডুবে গিয়েছিল, সঙ্গে ৬০০ জন ক্রু এবং স্বর্ণ-রূপার বিশাল কার্গো, যার মূল্য আজকের দিনে বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। এই জাহাজকে সমুদ্রতলের সর্ববৃহৎ ধনসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং প্রায়ই ‘শিপওয়ার্কের হোলি গ্রেইল’ বলা হয়।
ডুলির জন্য এই ধনসম্পদের সন্ধান কেবল পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে একটি ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষায় রূপান্তরিত হয়। তিনি জানেন যে সান জোসে কিউবার জলের বাইরে ডুবে আছে, ফলে তা সরাসরি কাস্ট্রোর অর্থনৈতিক স্বার্থে না হলেও, তিনি বিশ্বাস করেন যে একদিন এই গ্যালিয়নকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এই বিশ্বাসই তাকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রতল অনুসন্ধানে চালিত করে।
সেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডুলি চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ছিলেন। তার দু’টি আগ্রহ—সমুদ্রতল ধন অনুসন্ধান এবং সিনেমা—উভয়ই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, রোমান্টিক প্রকল্প, যেখানে সফলতা কম এবং ব্যর্থতা বেশি। দু’টি কাজের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় তাকে নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়; সমুদ্রের গোপন রহস্য উদ্ঘাটনের তীব্রতা এবং চলচ্চিত্রের গল্প বলার শিল্প একে অপরকে সমর্থন করে।
ডুলির সিনেমার প্রতি ভালোবাসা তার শৈশবের সময়ই গড়ে ওঠে। ১৯৫০-এর দশকে ব্রুকলিনে বেড়ে ওঠা তিনি এবং তার মা টাইমস স্কোয়ারের সিনেমা হলগুলোতে ঘন ঘন যেতেন। ১৯৫৭ সালে তার পরিবার কিউবায় স্থানান্তরিত হয়, যখন তার সৎপিতা একটি ব্যবস্থাপনা পদে নিযুক্ত হন। এই পরিবর্তন ডুলির জীবনে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়; কিউবার সমুদ্রের ইতিহাস এবং স্প্যানিশ নৌবাহিনীর ধনসম্পদের প্রতি তার আগ্রহ গড়ে ওঠে।
প্রায় ত্রিশ বছর ধরে ডুলি সমুদ্রতল অনুসন্ধানের কাজ চালিয়ে গেছেন, একই সঙ্গে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজেকে প্রকাশ করছেন। তার দুইটি পেশা একে অপরকে পরিপূরক করে, কারণ সমুদ্রের গোপন রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য এবং সৃজনশীলতা সিনেমার গল্প বলার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ডুলি তার অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে একটি বই প্রকাশ করেছেন, যার শিরোনাম ‘নেপচুনের ভাগ্য’। বইটি জানুয়ারি ২৭ তারিখে প্রকাশিত হয় এবং সান জোসে গ্যালিয়নের ইতিহাস, তার নিজস্ব অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা এবং সমুদ্রতল ধন অনুসন্ধানের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে একত্রিত করে। এই প্রকাশনা তার দীর্ঘমেয়াদী গবেষণার ফলাফলকে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে।
আজও ডুলি সান জোসের অবস্থান নির্ধারণের জন্য আধুনিক সোনার্ডার এবং সমুদ্রতল মানচিত্র ব্যবহার করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এখনো ধনসম্পদ পুনরুদ্ধার হয়নি, তার অনুসন্ধান আন্তর্জাতিক সমুদ্রতল গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং কিউবার সমুদ্রসম্পদ নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ডুলির গল্প দেখায় যে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহাসিক গবেষণা এবং সৃজনশীল শিল্পের সমন্বয় কীভাবে এক অনন্য যাত্রা গড়ে তুলতে পারে। সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা স্বর্ণ-রূপার স্বপ্ন, এবং সিনেমার জগতে তার স্বপ্নময় দৃষ্টিভঙ্গি, দুটোই আজও তাকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।



