ইতালির ফ্যাশন জগতের কিংবদন্তি ভ্যালেন্টিনো গারবানি, ৯৩ বছর বয়সে এই সপ্তাহে পরলোকগমন করেন। তার দীর্ঘায়ু ক্যারিয়ার, রোমের রোয়াল ক্লায়েন্ট এবং বিশ্ববিখ্যাত হাউসের গল্প এখনো বহু মানুষের মনে গেঁথে আছে। একই বছর, মেট টার্নাওয়ার পরিচালিত ‘ভ্যালেন্টিনো: দ্য লাস্ট এম্পারর’ শিরোনামের ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রটি প্রকাশিত হয়, যা ভ্যালেন্টিনোর বিলাসবহুল জগৎকে বিশদভাবে তুলে ধরেছে।
ডকুমেন্টারিটি ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শিত হয় এবং ফ্যাশন ডকুমেন্টারির মধ্যে অন্যতম শীর্ষকর্ম হিসেবে স্বীকৃত হয়। টার্নাওয়ার, যিনি মূলত ভ্যানিটি ফেয়ারের সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন, ২০০৪ সালে রোমে ভ্যালেন্টিনো ও তার ব্যবসায়িক সঙ্গী জিয়াঙ্কার্লো জিয়ামমেট্টিকে সাক্ষাৎকারের জন্য পাঠানো হন। ফ্যাশন ক্ষেত্রে তার কোনো পেশাগত পটভূমি না থাকলেও, রোমের সংস্কৃতি ও ইতিহাসে তার গভীর জ্ঞান তাকে এই কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছিল।
ইন্টারভিউয়ের সময় টার্নাওয়ারকে ভ্যালেন্টিনো ও জিয়ামমেট্টি তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জগতের দরজা খুলে দেন। তারা শুধু হাউসের অফিসিয়াল কাজ নয়, ব্যক্তিগত বাড়ি, পারিবারিক পোষা কুকুর এবং ঘনিষ্ঠ কর্মীবৃন্দের সঙ্গে টার্নাওয়ারের পরিচয় বাড়িয়ে দেন। এই বিস্তৃত প্রবেশাধিকার ডকুমেন্টারিটিকে এক অনন্য দৃষ্টিকোণ প্রদান করে, যেখানে ভ্যালেন্টিনোর সৃষ্টিশীলতা ও ব্যবসায়িক কৌশল উভয়ই সমানভাবে ফুটে ওঠে।
ভ্যালেন্টিনো ও জিয়ামমেট্টি কেন তরুণ, রোমের সঙ্গে পরিচিত এবং গে পরিচয়যুক্ত একজন আমেরিকানকে এতটা বিশ্বাস করলেন, তা টার্নাওয়ার নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, তাদের জন্য টার্নাওয়ার ছিলেন রোমের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত একজন তরুণ, যার ফলে তিনি সহজে তাদের জগতে প্রবেশ করতে পারলেন। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুজনই তৎক্ষণাৎ চলচ্চিত্রের জন্য সম্মতি জানিয়ে দেন, যা তাদের জন্য আরেকটি মার্কেটিং সুযোগের মতো মনে হয়েছিল।
ডকুমেন্টারিতে ভ্যালেন্টিনো ও জিয়ামমেট্টির ৬৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের গল্পও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। টার্নাওয়ার উল্লেখ করেন, তাদের সম্পর্ক কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি; যদিও সময়ে সময়ে অন্য সঙ্গী ও কর্মী যুক্ত হতেন, তবে ব্যবসা ও সৃজনশীল দিক থেকে দুজনই একসাথে কাজ চালিয়ে গেছেন। এই ধারাবাহিকতা তাদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এনে দেয়।
চলচ্চিত্রের মুক্তির পর ইতালীয় সংবাদমাধ্যমে ভ্যালেন্টিনোর যৌন পরিচয় সম্পর্কে শিরোনাম প্রকাশ পায়, যদিও তা আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। এই প্রকাশের ফলে ভ্যালেন্টিনো নিজে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন, কারণ তার গে পরিচয় দীর্ঘদিন গোপন রাখা হয়েছিল। তবে মিডিয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি চলচ্চিত্রের সামাজিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
ডকুমেন্টারির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল ভ্যালেন্টিনোর হেডকোয়ার্টার, যা রোমের পিয়াজা ডি স্পানিয়া-তে অবস্থিত পিয়াজা মিগনানেল্লিতে রয়েছে। এখানে হাউসের সৃজনশীল কর্মশালা, শোরুম এবং প্রশাসনিক অফিস একসাথে সংযুক্ত, যা ভ্যালেন্টিনোর কাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। টার্নাওয়ার এই স্থানের বর্ণনা দিয়ে বলেন, এটি ভ্যালেন্টিনোর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবসায়িক কৌশলের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে।
‘ভ্যালেন্টিনো: দ্য লাস্ট এম্পারর’ ডকুমেন্টারিটি ফ্যাশন জগতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এর বিশদ চিত্রায়ন, ব্যক্তিগত গল্প এবং ভ্যালেন্টিনোর সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়ার গভীর বিশ্লেষণকে নিয়ে এটি বহু সমালোচকের প্রশংসা পেয়েছে। আজও এই চলচ্চিত্রটি ফ্যাশন ডকুমেন্টারির ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের ডিজাইনারদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
ভ্যালেন্টিনোর মৃত্যু এবং তার জীবনকে সম্মান জানিয়ে তৈরি এই ডকুমেন্টারিটি তার অবদানের একটি চিরস্থায়ী স্মারক হিসেবে কাজ করবে। রোমের রাস্তায় তার নামের প্রতিধ্বনি শোনা যায়, এবং তার হাউসের প্রতিটি সেলাইতে তার সৃজনশীলতা এখনও বেঁচে আছে। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভ্যালেন্টিনোর গল্প নতুন পাঠক ও দর্শকের কাছে পৌঁছাবে, যা ফ্যাশন শিল্পের ইতিহাসে তার স্থানকে আরও দৃঢ় করবে।
ফ্যাশন ও সংস্কৃতি প্রেমিকদের জন্য ‘ভ্যালেন্টিনো: দ্য লাস্ট এম্পারর’ একটি অপরিহার্য দৃষ্টান্ত। এটি শুধুমাত্র একটি ডিজাইনারের জীবনী নয়, বরং একটি যুগের শৈল্পিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। ভ্যালেন্টিনোর ৯৩ বছর বয়সে বিদায়ের পরও, তার কাজ ও দৃষ্টিভঙ্গি এই ডকুমেন্টারির মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাবে।



