সকাল ১০:৪০ টায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (CPA) পাইলটের দ্রুত হস্তক্ষেপে কার্নফুলি চ্যানেলে LPG বহনকারী জাহাজের সম্ভাব্য বিশাল দুর্ঘটনা রোধ করা যায়। ১৫৯.৯ মিটার লম্বা গ্যাস হারমনি নামের জাহাজটি ইউনাইটেড ট্যাঙ্ক টার্মিনাল জেটিতে বন্দরিং করার সময় ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং কাছাকাছি থাকা KAFCO অ্যামোনিয়া জেটির দিকে অগ্রসর হয়। এই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণ না হতো, তবে জাহাজে সংরক্ষিত প্রোপেন ও বুটেনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারত, যা বন্দর অবকাঠামো ও নৌচলাচল চ্যানেলকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।
গ্যাস হারমনি জাহাজে প্রায় ৫,০৮৫ মেট্রিক টন তরল গ্যাস লোড ছিল, যার মধ্যে ৫১৫ টন প্রোপেন এবং ৪,৫৭০ টন বুটেন অন্তর্ভুক্ত। এই পরিমাণের গ্যাসের বাজারমূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে শীতল ঋতুতে গৃহস্থালী ও শিল্পখাতে চাহিদা বাড়ার সময়। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, জাহাজটি বন্দরিং প্রক্রিয়ার মাঝামাঝি সময়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়, ফলে জাহাজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রিফট হয়ে KAFCO জেটির দিকে এগিয়ে যায়।
সিনিয়র মেরিন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তার মতে, ইঞ্জিনের ত্রুটি জাহাজকে ধীরগতিতে ড্রিফট করতে বাধ্য করে, ফলে তা পার্শ্ববর্তী অ্যামোনিয়া ট্যাঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ সীমার মধ্যে প্রবেশ করে। KAFCO জেটি অ্যামোনিয়া গ্যাস সংরক্ষণ করে, যা LPG এর সঙ্গে মিশ্রিত হলে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই জাহাজের এই অপ্রত্যাশিত বিচ্যুতি বন্দর নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল।
এই সংকটের মুহূর্তে CPA-র সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ, যিনি জাহাজে ডিউটি ছিলেন, তৎক্ষণাৎ দুইটি অ্যাঙ্কর এবং টাগবোটের সাহায্য নিয়ে জাহাজের গতি কমাতে নির্দেশ দেন। পাইলটের সঠিক নির্দেশনা ও টাগবোটের সমন্বিত কাজের ফলে গ্যাস হারমনি প্রায় ১.২ মিটার দূরত্বে জেটি কাঠামো থেকে থেমে যায়। এই দ্রুত পদক্ষেপ জাহাজকে সম্পূর্ণ থামাতে সক্ষম হয় এবং সম্ভাব্য বিস্ফোরণকে বাধা দেয়।
বিপদের সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (VTMS) এর মাধ্যমে পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সিস্টেমের ডেটা ব্যবহার করে জাহাজের অবস্থান, গতি এবং ড্রিফটের দিক নির্ণয় করেন, ফলে সমন্বিত পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তিগত সমর্থন ও মানবিক দক্ষতার সমন্বয়ই ঘটনাটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অবশেষে, কোনো প্রাণহানি, সম্পদ ক্ষতি বা পরিবেশগত প্রভাব ঘটেনি। জাহাজের দ্রুত থামার ফলে বন্দর অবকাঠামো, পার্শ্ববর্তী ট্যাঙ্ক ও নৌচলাচল চ্যানেল নিরাপদে রয়ে যায়। CPA-র প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক পদক্ষেপ ও সমন্বিত টিমওয়ার্কের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো হয়েছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনা LPG বাজারে অস্থায়ী উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দ্রুত নিয়ন্ত্রণের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কমে যায়। বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যকরী প্রতিক্রিয়া শিপিং কোম্পানি ও বীমা সংস্থার আস্থা বজায় রাখে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক চুক্তি ও লোডিং রেটের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। তদুপরি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃঢ়তা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করে।
এই ঘটনার পর, CPA নিরাপত্তা প্রোটোকল পুনর্বিবেচনা ও ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার কঠোরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে। অতিরিক্তভাবে, টাগবোটের সংখ্যা বৃদ্ধি, অ্যানকরিং সিস্টেমের আধুনিকীকরণ এবং VTMS এর রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ ক্ষমতা উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে বন্দর পরিচালনার দক্ষতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করবে, যা বাণিজ্যিক প্রবাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে।
সারসংক্ষেপে, গ্যাস হারমনি জাহাজের বিচ্যুতি দ্রুত থামিয়ে বড় দুর্ঘটনা রোধে পাইলটের সাহসিকতা ও বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কাজের প্রশংসা করা যায়। এই ঘটনা চট্টগ্রাম বন্দরকে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক পর্যবেক্ষণ সিস্টেমের ব্যবহার অপরিহার্য হবে।



