আফগানিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য উপমন্ত্রী আহমাদুল্লাহ জাহিদ প্রথম সরকারি সফরে বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে গেছেন। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকা‑কাবুল বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়ানো, সরাসরি পণ্যবাহী বিমান সেবা চালু করা এবং বাংলাদেশি বিনিয়োগকে আফগান বাজারে উৎসাহিত করা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাহিদের সফরটি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আমন্ত্রণে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সফরের সময় তিনি বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এবং ইপিবি ভাইস‑চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফের সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং সরাসরি পণ্যবাহী উড়োজাহাজের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
বাণিজ্য সচিবের মতে, উভয় পক্ষই শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণে সম্মত হয়েছে। এছাড়া, আফগানিস্তান বাংলাদেশ থেকে ওষুধের আমদানি বাড়াতে আগ্রহী, যা দু’দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরের জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলে দিতে পারে।
সপ্তাহের মাঝামাঝি, জাহিদ ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে একটি সেমিনারেও উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে তিনি আফগান বাজারের চাহিদা, বিশেষত ঔষধ, টেক্সটাইল এবং কৃষি পণ্যের দিকে আলোকপাত করেন এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগের কথা জানান।
সেমিনার শেষে, জাহিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরের দিন তিনি ঢাকা ভিত্তিক দুইটি প্রধান ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি—স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালস—পরিদর্শন করবেন। এই সফরের লক্ষ্য হল ওষুধের সরবরাহ শৃঙ্খল, গুণগত মান এবং মূল্য নির্ধারণের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা, যাতে আফগানিস্তানে বাংলাদেশি ঔষধের প্রবেশ সহজ হয়।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সরাসরি পণ্যবাহী উড়োজাহাজের প্রস্তাব উভয় দেশের লজিস্টিক খরচ কমাতে এবং সময়সীমা হ্রাস করতে পারে। বর্তমানে, দু’দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন মূলত তৃতীয় দেশের মাধ্যমে হয়, যা অতিরিক্ত শুল্ক ও লজিস্টিক জটিলতা সৃষ্টি করে। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে, রপ্তানি-আমদানি পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত, বিশেষত কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প এবং ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের ক্ষেত্রে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, আফগানিস্তানের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে, বাংলাদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাজারের দরজা খুলে যাবে। বিশেষত, বাংলাদেশি টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের জন্য আফগানিস্তানের তরুণ জনসংখ্যা একটি সম্ভাব্য গ্রাহক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে, আফগানিস্তানের ফার্মাসিউটিক্যাল চাহিদা বাড়ার ফলে বাংলাদেশি ঔষধের রপ্তানি বাড়তে পারে, যা দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
তবে, দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দৃঢ় করতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা ও বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন, এবং তা দ্রুত সম্পন্ন না হলে পরিকল্পনা বিলম্বিত হতে পারে। এছাড়া, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কিত উদ্বেগও বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, আহমাদুল্লাহ জাহিদের সফর দু’দেশের বাণিজ্যিক সংযোগকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। সরাসরি পণ্যবাহী উড়োজাহাজ, শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং ফার্মাসিউটিক্যাল আমদানি বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের বাজার প্রসারিত হবে এবং আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে অবদান রাখবে। ভবিষ্যতে উভয় দেশের বাণিজ্যিক মন্ত্রণালয় যদি এই আলোচনাকে নীতিগত ভিত্তিতে রূপান্তরিত করে, তবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিমাণে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সফরের ফলাফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যায়।



