চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত র্যাবের উপসহকারী পরিচালক মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালিরবাজার ইউনিয়নের অলিপুর গ্রামকে শোকে মুছে দিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামটি তার বাড়ির কাছাকাছি জড়ো হওয়া স্বজনদের কান্নায় ভেসে গিয়েছিল।
মোতালেব হোসেন অলিপুরের আবদুল খালেক ভূঁইয়ার ছোট ছেলে, আট ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সর্বনিম্ন বয়সী। তিনি এক সন্তান ও দুই কন্যার পিতা এবং তার স্ত্রী ও সন্তানরা রাজধানীর পিলখানা এলাকায় বসবাস করতেন। পরিবারে তার ভদ্রতা ও বিনয়ী স্বভাবের জন্য তিনি সর্বদা সম্মানিত ছিলেন।
সন্ত্রাসী হামলাটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে, জঙ্গল সলিমপুরে ঘটেছিল, যেখানে র্যাবের একাধিক সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মোতালেব হোসেনের দেহ উদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তীতে তার গ্রামীয় বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হামলায় র্যাবের অন্যান্য সদস্যদেরও আঘাতের খবর পাওয়া গিয়েছে।
মোটামুটি বিকেল চারটায় গ্রামবাসীরা মোতালেবের বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে কান্না ও শোক প্রকাশ করছিল। স্বজনদের মধ্যে তার ভাইবোন, বোনের সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গ্রামের মানুষরা শোকের মুহূর্তে একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কাঁদা থামছিল না।
মোতালেবের বাড়ির পাশে তার আট ভাইয়ের বাড়ি পাশাপাশি অবস্থিত। তিনি নিজের বাড়িতে একতলা ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তবে কাজটি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। নির্মাণাধীন ভবনের পাশে একটি টিনের ঘর ছিল, যেখানে স্বজনরা তার নিথর দেহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
টিনের ঘরের সামনে স্বজনদের ভিড় জমে ছিল। তারা দেহটি দেখার জন্য, শেষ বিদায় জানাতে এবং প্রার্থনা করার জন্য একত্রিত হয়েছিল। কিছু লোক ঘরে বসে নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন, অন্যরা মাটিতে বসে দুঃখ প্রকাশ করছিলেন।
সাইফুল ইসলাম, একই গ্রাম থেকে, মোতালেবের চাচা এবং শৈশবের বন্ধু, দুঃখের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না আমার মামা মোতালেব আর নেই।” তিনি উল্লেখ করেন যে দুজনই ১৯৯৩ সালে একসাথে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং একসাথে পড়াশোনা করতেন।
সাইফুলের মতে, প্রায় পনেরো দিন আগে মোতালেব হঠাৎ ফোন করে বাড়িতে আসতে বলেছিলেন এবং সঙ্গে অনেকগুলো মাছ নিয়ে আসতে অনুরোধ করেছিলেন। এটাই তাদের শেষ সাক্ষাৎ ছিল। সাইফুল জানান, মোতালেব ১৯৯৬ সালে র্যাবে যোগ দেন এবং ২০০২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি গ্রামবাসীর চোখে এক দয়ালু ও শালীন মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
হামলার পর পুলিশ ও র্যাব তদন্ত দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিক তদন্ত চালু করেছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পরিচয় ও হামলার পদ্ধতি নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সাক্ষী সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির সম্পূর্ণ দায়িত্বশীলদের গ্রেফতার করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আইনি দিক থেকে, র্যাবের উপসহকারী পরিচালক হিসেবে মোতালেবের মৃত্যুর জন্য সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী অপরাধের শাস্তি প্রয়োগের জন্য মামলা দায়ের করা হবে। তদন্তের ফলাফল অনুযায়ী আদালতে অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে।
গ্রামবাসীরা শোকের ছায়ায় দিন কাটাচ্ছেন, তবে তারা একসাথে মিলিত হয়ে মৃতের স্মরণে প্রার্থনা ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন। মোতালেবের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের জন্য এই দুঃখজনক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে স্মরণীয় থাকবে, এবং গ্রামটি তার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সমাবেশের পরিকল্পনা করছে।



