২০ জানুয়ারি সকাল প্রায় ৭টায় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর দল পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) কার্যালয় কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে। নিরাপত্তা রক্ষীদের সরিয়ে নেওয়ার পর তারা বুলডোজার ব্যবহার করে প্রধান ভবনসহ কয়েকটি ছোট কাঠামো ধ্বংস করা শুরু করে। এই কাজটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে ইউএনআরডব্লিউএ গম্ভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ইউএনআরডব্লিউএর মুখপাত্র জানান, কম্পাউন্ডে প্রবেশের সময় তাদের কর্মীরা কোনো প্রতিরোধ দেখায়নি এবং নিরাপত্তা কর্মীদের বের করে নেওয়ার পরই ধ্বংস কাজ শুরু হয়। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের আক্রমণ ইউনাইটেড নেশনসের বিশেষ সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন, যা পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। এছাড়া তিনি সতর্কতা জানিয়ে বলেন, আজকের ঘটনা আগামীকাল অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা কূটনৈতিক মিশনের ওপরও ঘটতে পারে।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধ্বংসকর্মকে বৈধতা প্রদান করে জানিয়েছে যে, জেরুজালেমের ঐ কম্পাউন্ডটি ইসরায়েল রাষ্ট্রের মালিকানাধীন এবং তাই তা কোনো নতুন নীতি নয়। মন্ত্রণালয় যুক্তি দেয় যে, এই পদক্ষেপটি ইউএনআরডব্লিউএ এবং হামাসের মধ্যে বিদ্যমান ইসরায়েলি আইনের প্রয়োগের অংশ। তারা জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে এই কাজটি সম্পন্ন হয়েছে।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ইউএনআরডব্লিউএর কিছু কর্মীকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করে আসছে। বিশেষ করে ৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের আক্রমণে কিছু কর্মীর অংশগ্রহণের দাবি করা হয়েছে, যা গাজা অঞ্চলে যুদ্ধের সূচনা করে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ইসরায়েল ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়।
ইউএনআরডব্লিউএর অফিস গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে সংস্থার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সহায়তা ও আশ্রয় প্রদানকারী কার্যক্রমে বড় ধাক্কা লাগবে। পূর্ব জেরুজালেমে অবস্থিত এই কার্যালয়টি শরণার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবা কেন্দ্র ছিল, যেখানে হাজারো পরিবারকে মৌলিক সেবা প্রদান করা হতো। ধ্বংসের পর এই সেবাগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে, যা শরণার্থীদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইসরায়েলের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করছেন। তারা জোর দিয়ে বলছেন, জাতিসংঘের সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য বিপজ্জনক প্রস্তাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের এই কাজের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
ইসরায়েলি সরকার দাবি করে যে, ইউএনআরডব্লিউএর কিছু কর্মী গাজা অঞ্চলে হামাসের কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত ছিল এবং তাই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যুক্তিযুক্ত। তবে ইউএনআরডব্লিউএ এই অভিযোগকে অস্বীকার করে এবং সংস্থার মানবিক কাজের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন দাবি করে।
ইউএনআরডব্লিউএর মুখপাত্রের মতে, আজকের ঘটনার পর সংস্থার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন আক্রমণ রোধে আন্তর্জাতিক সংস্থার সুরক্ষা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হবে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সংস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়নি।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, ভবিষ্যতে ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো নতুন নীতি না থাকলেও, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সংস্থার কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে। এই ঘোষণার ফলে ইউএনআরডব্লিউএর কর্মী ও শরণার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ বাড়বে এবং মানবিক সহায়তার প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
বিশ্বের প্রধান দেশগুলো এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের মান বজায় রাখতে আহ্বান জানিয়েছে। কিছু দেশ সংযুক্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধ করা যায়। তবে ইসরায়েল এখনও তার পদক্ষেপকে বৈধ বলে দাবি করে এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
এই ঘটনার পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো জেরুজালেমে ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম পুনরায় চালু করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শরণার্থীদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার জন্য নতুন চুক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রতিক্রিয়া এবং ইসরায়েলি নীতির পরিবর্তনের ওপর।



