ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) মঙ্গলবার দুপুরে তার সদর দফতরে একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে, যেখানে শহরের ভাড়াটিয়া ও গৃহমালিকের অধিকার সুরক্ষার জন্য ১৬ ধাপের নতুন নির্দেশনা জানানো হয়। নির্দেশিকাটি ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন‑১৯৯১’ ভিত্তিক এবং দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধি নিষিদ্ধ, ভাড়াটিয়া যে কোনো সময়ে বাসায় প্রবেশের অধিকার, এবং মূল গেট ও ছাদের চাবি ভাড়াটিয়াকে প্রদান করার শর্ত আরোপ করে।
ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের মতে, বর্তমান সময়ে ঢাকা মহানগরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ বসবাসের জন্য আসছেন, তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা ২০ থেকে ২৫ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর ফলে শহরের বাসিন্দাদের একটি বিশাল অংশই ভাড়াটিয়া, এবং গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, ব্যক্তিগত ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্রীয়করণ শহরের বাসস্থান চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।
বহু গবেষণায় দেখা যায়, কোনো শহরে যদি গৃহস্থালীর আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশই বাসস্থানে ব্যয় হয়, তবে তা স্বাভাবিক বলে ধরা হয়। তবে ঢাকায় অনেক পরিবারকে আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়ার জন্য দিতে হচ্ছে, যা গৃহস্থালীর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। নতুন নির্দেশিকায় এই সমস্যার সমাধানে গৃহমালিক ও ভাড়াটিয়ার দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রথম ধাপের অধীনে গৃহমালিককে তার সম্পত্তি বাসযোগ্য অবস্থায় রাখতে হবে। এর মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে ভাড়াটিয়া গৃহমালিককে জানাবে, এবং গৃহমালিককে দ্রুত সমাধান প্রদান করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে গৃহমালিক ও ভাড়াটিয়া (গৃহমালিকের অনুমোদনে) বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং সামনের উন্মুক্ত স্থানে গাছপালা, ফুল, ফল বা সবজি চাষের মাধ্যমে সবুজায়ন করতে হবে। এই পদক্ষেপটি নগর পরিবেশের মান উন্নয়ন এবং বাসিন্দাদের জন্য শীতল পরিবেশ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় ধাপটি নিরাপত্তা সংক্রান্ত। অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়াকে ছাদের এবং মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে প্রদান করতে হবে, যাতে জরুরি অবস্থায় দ্রুত বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়।
চতুর্থ ধাপে ভাড়াটিয়ার আর্থিক দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে। ভাড়াটিয়া মাসের দশ তারিখের মধ্যে গৃহমালিককে ভাড়া প্রদান করবে, এবং গৃহমালিককে প্রতিমাসে লিখিত ভাড়ার রশিদ প্রদান করতে হবে। রশিদে ভাড়ার পরিমাণ, তারিখ এবং গৃহমালিকের স্বাক্ষর থাকতে হবে, যা ভবিষ্যতে কোনো বিরোধের ক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ কাজ করবে।
পঞ্চম ধাপটি ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, গৃহমালিক দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। এই বিধি ভাড়াটিয়ার আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং হঠাৎ ভাড়া বৃদ্ধি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছে।
ছয় নম্বর ধাপে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে চুক্তিপত্রে ভাড়ার শর্তাবলী, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিবরণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। চুক্তি না থাকলে গৃহমালিককে তা লিখিতভাবে প্রস্তুত করে ভাড়াটিয়ার স্বাক্ষর নিতে হবে।
সপ্তম ধাপের অধীনে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে এবং তার ব্যক্তিগত তথ্য অনধিকৃতভাবে ব্যবহার করা যাবে না। গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার অনুমতি ছাড়া বাড়িতে কোনো তৃতীয় পক্ষকে প্রবেশের অনুমতি দিতে পারবে না।
অষ্টম ধাপে গৃহমালিককে বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে এবং ভাড়াটিয়ার জানানো সমস্যার সমাধান দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। যদি গৃহমালিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান না করে, তবে ভাড়াটিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবে।
নবম ধাপটি গৃহমালিকের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বাড়ির কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যেমন ছাদ, দেয়াল এবং দরজার মেরামত। গৃহমালিককে নিয়মিতভাবে বাড়ির নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মেরামত সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে।
দশম ধাপের অধীনে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ির ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো পরিবর্তন, যেমন বাড়ির অংশ ভাড়া দেওয়া বা পুনর্নির্মাণ, পূর্বে জানাতে হবে এবং ভাড়াটিয়ার সম্মতি নিতে হবে।
এগারো নম্বর ধাপটি ভাড়াটিয়ার অধিকার রক্ষার জন্য গৃহমালিককে ভাড়া বাড়ানোর পূর্বে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন না পেলে ভাড়া বৃদ্ধি অবৈধ বলে গণ্য হবে।
বারো নম্বর ধাপে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে সমঝোতা না হলে, উভয় পক্ষকে মধ্যস্থতাকারী সংস্থার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে। মধ্যস্থতাকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার বা স্বতন্ত্র সংস্থা হতে পারে।
তেরো নম্বর ধাপটি গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে চুক্তি বাতিলের শর্তাবলী স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে, যাতে উভয় পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব পরিষ্কার থাকে। চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে ন্যূনতম নোটিশ সময় এবং ফেরতযোগ্য ডিপোজিটের শর্তাবলী নির্ধারিত হবে।
চৌদ্দ নম্বর ধাপে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ির অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র, জরুরি লাইট এবং সুরক্ষা দরজা ইনস্টল করতে হবে। এই সরঞ্জামগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ গৃহমালিকের দায়িত্ব।
পনেরো নম্বর ধাপটি গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য আপডেট রাখতে হবে এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ ধাপের অধীনে গৃহমালিককে ভাড়াটিয়ার সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে বাড়ির অবস্থান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনা করতে হবে, যাতে উভয় পক্ষের মতামত শোনা যায় এবং সমন্বয় বজায় থাকে।
ডিএনসিসি এই নির্দেশিকাকে শহরের বাসস্থান সমস্যার সমাধান এবং ভাড়াটিয়া-গৃহমালিকের মধ্যে সুষ্ঠু সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে এই নীতিমালা কার্যকর করার জন্য পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করা যায়।



