মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি কানাডাকে নতুন কূটনৈতিক জোট এবং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের সন্ধানে বাধ্য করেছে। ট্রাম্প ডেনমার্ককে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চাপ বাড়িয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা উন্মোচন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কার্নি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ড্যাভোস) পূর্বে কাতারের রাজধানী দোহায় এক সিরিজ বৈঠকে অংশ নেন, যেখানে তিনি বহুপাক্ষিক কাঠামোর দুর্বলতা ও নতুন সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
দোহায় কার্নি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন দেশের স্বার্থের সংঘর্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি কানাডার প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন চুক্তির অগ্রগতির কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি জোর দেন, কানাডা সমমানের মানসিকতার দেশগুলোর সঙ্গে সীমিত সংখ্যক চুক্তির মাধ্যমে অগ্রসর হতে চায়, যাতে কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয় নিশ্চিত হয়।
কার্নি আরও উল্লেখ করেন, কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে চায়। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ভূমিকা উভয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা হ্রাসে সহায়তা করবে। দোহায় তার সাক্ষাৎকারে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ বলেন, বর্তমান অস্থির সময়ে কানাডা নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করবে এবং সহযোগী দেশগুলোকে এক টেবিলে আনবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাণিজ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২৫ বছরের আলোচনার পর তারা দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্য জোট মারকোসুরের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ভারতের সঙ্গে নতুন আলোচনাও পুনরায় শুরু করেছে। ইউরোপের মোট রপ্তানির মাত্র ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়, যেখানে কানাডার প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে প্রবাহিত হয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, কানাডা যদি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ভাগ ১০ শতাংশ কমাতে চায়, তবে চীন, জার্মানি, ফ্রান্স, মেক্সিকো, ইতালি এবং ভারতের সঙ্গে রপ্তানি দ্বিগুণ করতে হবে। কার্নি আগামী দশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কানাডার রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেন, এই লক্ষ্য অর্জনে চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম পেলরিনের মতে, চীনের সঙ্গে দ্রুত এবং গভীর অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপন কানাডার আর্থিক স্থিতিশীলতায় অনিচ্ছাকৃত সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘমেয়াদে এমন সম্পর্কের ফলে বাজারের অস্থিরতা এবং নীতি ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা তার বাণিজ্যিক কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে, যাতে বৈচিত্র্য বজায় রেখে নিরাপদ ও টেকসই অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের নীতি চাপ কানাডাকে নতুন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিকনির্দেশনা অনুসন্ধানে প্ররোচিত করেছে। দোহায় কার্নি এবং আনিতা আনন্দের ঘোষণার ভিত্তিতে কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখছে। এই পরিবর্তনগুলো কানাডার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করতে পারে, তবে চীনের সঙ্গে বাড়তি নির্ভরতা নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।



