ঢাকা, ২০ জানুয়ারি – বাংলাদেশ জামায়াত‑ইসলামি (বজিএ) গত মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে আয়োজিত পলিসি সামিট‑২০২৬-এ একাধিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি ঘোষণা করে। সমাবেশে দলটির নীতিনির্ধারক ও প্যানেলিস্টরা নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। প্রধান লক্ষ্যগুলো হল বেকারত্ব কমানো, করভিত্তি হ্রাস, এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ।
সমাবেশে ঘোষিত প্রথম মূল নীতি হল দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা গ্রহণ। দলটি জোর দিয়ে বলেছে যে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং এর জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা গৃহীত হবে। একই সঙ্গে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ধাপে ধাপে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মোট করের হার ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ক্ষেত্রে স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু করার কথা বলা হয়েছে, যা জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ট্যাক্স আইডি (টিআইএন), স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একত্রে সংযুক্ত করবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নাগরিকদের সেবা গ্রহণ সহজ হবে এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
শক্তি ও পানির দিক থেকে আগামী তিন বছরের মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জে কোনো বৃদ্ধি না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্ধ থাকা কলকারখানাগুলো পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পুনরায় চালু করা হবে, যেখানে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা প্রদান করা হবে। এই ব্যবস্থা কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্পের পুনরুজ্জীবনকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়নের জন্য সহজ লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গৃহীত হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ সুবিধা প্রদান করা হবে, যা কৃষি উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।
বিশেষভাবে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারী কর্মসূচি অনুযায়ী, গ্র্যাজুয়েশন শেষের পর চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে মাসিক সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা সুদবিহীন ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান করা হবে। এই ঋণটি বেকারত্বের ঝুঁকি কমিয়ে তরুণদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে লক্ষ্য করা হয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও সমানভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেধা ও আর্থিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০,০০০ টাকা সুদবিহীন শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে। তদুপরি, প্রতি বছর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদবিহীন শিক্ষাঋণ দিয়ে সহায়তা করা হবে, যাতে গরিবের মেধাবী সন্তানও হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড বা ক্যামব্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে।
নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনোমিক্স কলেজকে একত্রিত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বড় কলেজগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ও প্রবেশযোগ্যতা বাড়াবে।
সমাবেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে ভবিষ্যতে সব সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে, যদিও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত করা বাকি। এই নীতিগুলোকে বাস্তবায়ন করতে সরকারী ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন হবে।
বজিএর পলিসি সামিট‑২০২৬-এ উপস্থাপিত পরিকল্পনাগুলো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। কিছু বিশ্লেষক দাবি করেন যে কর হ্রাস ও সুদবিহীন ঋণ নীতি আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তবে দলটি বলছে যে এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক হবে।
পরবর্তী ধাপে দলটি এই নীতিগুলোকে আইনগত রূপ দিতে পার্লামেন্টে প্রস্তাবনা পেশ করবে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি নির্ধারণের নির্দেশ দেবে। সমাবেশের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনে এই নীতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।



